বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর আজ সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে নির্বাচিত সাংসদ ও মন্ত্রীদের শপথ পাঠ অনুষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, কেমন হচ্ছে তারেক রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভা? দ্য ভয়েস২৪-এর পাঠকদের জন্য তারেক রহমানের মন্ত্রীসভার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
মন্ত্রিসভা ৪০-এর আশপাশে
সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, শুরুতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মিলিয়ে মোট সদস্যসংখ্যা ৪০ জনের কাছাকাছি হতে পারে। যদিও কেউই নাম প্রকাশ করে নিশ্চিত করতে রাজি নন।
শপথের প্রস্তুতি হিসেবে পরিবহন পুল থেকে ৩৭টি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সমানসংখ্যক সরকারি বাসাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ সংখ্যা সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার আকারের সঙ্গেই প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন, তা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার।
আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “সরকার গঠন, সরকারে কে কোন দায়িত্বে থাকবে এসব নিয়ে দলের চেয়ারম্যান কাজ করছেন। আমি কোনও নামের বিষয়ে জানতে পারিনি।” তিনি জানান, সোমবার বিকাল পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেও কোনো ফোন পাননি।
জাতীয় সরকার—হচ্ছে কি?
২৯৭ আসনের মধ্যে ২০৯টি জিতে সরকারপ্রধান হচ্ছেন তারেক রহমান। তার বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন; মা খালেদা জিয়া তিন দফায় ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার নেতৃত্বে আসছেন তাদের উত্তরসূরি।
জাতীয় সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। নির্বাচিতদের বাইরে টেকনোক্র্যাট কোটায় চারজন থাকতে পারেন—এমন গুঞ্জন আছে। তবে শরিক দলগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “বিএনপির সঙ্গে সরকার গঠন নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।”
তিনি জানান, রোববার তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেও নতুন সরকার প্রসঙ্গে কোনো আলাপ হয়নি।
কারা আলোচনায়?
দলীয় সূত্র বলছে, আগের মন্ত্রিসভায় থাকা বিতর্কমুক্ত বা কম বিতর্কিত জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কয়েকজন নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে মন্ত্রিসভা সাজানো হচ্ছে।
সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান নিজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রাখতে পারেন—এমন আলোচনা রয়েছে।
জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও আবদুল আউয়াল মিন্টুর নাম বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য দায়িত্বে ঘুরছে। তবে দলের একাধিক সূত্র বলছে, মির্জা ফখরুল মন্ত্রিত্ব নিতে অনাগ্রহী; সংসদের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করেননি।
অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য, জনপ্রশাসন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আব্দুস সালাম পিন্টু, হুমায়ুন কবীর (টেকনোক্র্যাট কোটা) ও রেজা কিবরিয়ার নাম শোনা যাচ্ছে।
আইন, সড়ক পরিবহন, কৃষি, আইসিটি, খাদ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মাহবুব উদ্দিন খোকন, আমান উল্লাহ আমান, নওশাদ জমির ও এহসানুল হক মিলনের নাম রয়েছে আলোচনায়।
স্বাস্থ্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে এজেডএম জাহিদ হোসেন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নিতাই রায় ও শামা ওবায়েদের নাম উঠে এসেছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় সানজিদা ইসলাম তুলি ও মাহদী আমিনের নামও শোনা যাচ্ছে। ধর্ম, পানিসম্পদ, প্রবাসী কল্যাণ, প্রাণী ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ে মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, লুৎফুজ্জামান বাবর ও জয়নাল আবদিন ফারুকের নাম আলোচনায় রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে ফজলুর রহমানের নাম ঘুরছে—যদিও তিনি নিজে নিশ্চিত নন।
শরিকদের জায়গা মিলছে?
গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত কয়েকজন নেতার নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে বলে বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন। আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি, ববি হাজ্জাজ (পরে বিএনপিতে যোগ দেন) ও নুরুল হক নুরের নাম রেল, নৌ পরিবহন, ভূমি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য দায়িত্বে আলোচিত। তবে ববি হাজ্জাজের বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যায় এক কর্মকর্তা বলেন, আলোচনা চলছে। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জানান, তিনি ‘মিটিংয়ে’ আছেন।
এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচিত ছয় সংসদ সদস্যের কাউকে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখার বিষয়েও ভাবনা রয়েছে।
সংসদ উপনেতা ও স্পিকার
সংসদকে সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়মিত জবাবদিহির বার্তা দিয়েছেন তারেক রহমান। সংসদ উপনেতা হিসেবে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় রয়েছে।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে সংসদ উপনেতা করেছিলেন। এবারও সংসদকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রাখতে স্পিকার ও সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি পদে অভিজ্ঞ সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, পুরনো অভিজ্ঞতা ও নতুন মুখের সমন্বয়ে তুলনামূলক ছোট কিন্তু কৌশলগতভাবে সাজানো একটি মন্ত্রিসভা গঠনের পথে এগোচ্ছে বিএনপি। মঙ্গলবার শপথের পরই স্পষ্ট হবে জল্পনার শেষ অধ্যায়।







