আধুনিক জীবনে রমজানের প্রস্তুতি বলতে আমরা সাধারণত ইফতারের বাজার, কেনাকাটা কিংবা বাহ্যিক আয়োজনকেই বেশি গুরুত্ব দিই। অথচ ইসলামের সোনালি যুগের মানুষ—সালাফে সালেহিনদের কাছে রমজান ছিল কেবল একটি মাস নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। তাই তাঁদের প্রস্তুতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল আত্মিক পরিশুদ্ধতা, মানসিক দৃঢ়তা ও ইবাদতের গভীর পরিকল্পনা।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা ও পরিকল্পনার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। প্রসিদ্ধ তাবেয়ি মুয়াল্লা বিন ফজল (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম বছরের ছয় মাস আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন—তিনি যেন তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। আর রমজান শেষ হওয়ার পরবর্তী পাঁচ মাস তাঁরা দোয়া করতেন, যেন আল্লাহ তাঁদের ইবাদত কবুল করেন। অর্থাৎ, তাঁদের পুরো বছর আবর্তিত হতো রমজানকে ঘিরে। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজেও রজব মাসের চাঁদ দেখলে আবেগভরে দোয়া করতেন—
‘হে আল্লাহ, আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দিন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ (বায়হাকি: ৩৫৩৪)
রমজানের গুরুত্ব বোঝাতে দিন-তারিখের হিসাব রাখাও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) শাবান মাসের দিন-তারিখের প্রতি যে পরিমাণ গুরুত্ব দিতেন, অন্য কোনো মাসে তা দিতেন না। (আবু দাউদ: ২৩২৫) তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিতেন—
‘তোমরা রমজানের জন্যে শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ: ২/১০৩)
এতে মুমিনদের মনে রমজানের প্রতি আগ্রহ, প্রস্তুতি ও ইবাদতের আন্তরিকতা বৃদ্ধি পেত।
সালাফদের কাছে শাবান মাস ছিল রমজানের ইবাদতের মহড়া। বিশেষ করে কোরআন তেলাওয়াতের প্রস্তুতি শুরু হতো এই মাস থেকেই। তাবেয়ি আমর বিন কাইস (রহ.) শাবান শুরু হলে ব্যবসা বন্ধ করে পুরো সময় কোরআন অধ্যয়নে ব্যয় করতেন। তাঁদের ভাষায়, ‘শাবান হলো তেলাওয়াতকারীদের মাস’। এ মাসে রাসুলুল্লাহ (স.)-ও অধিক নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে শাবানের মতো অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি। (মুসলিম: ১১৫৬) দীর্ঘ নামাজ ও সেজদার মাধ্যমে তাঁরা রমজানের দীর্ঘ তেলাওয়াতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন।
গুনাহ মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে তোলে এবং ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে দেয়। তাই সাহাবিরা রমজানের আগেই তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজেদের আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করতেন। একই সঙ্গে রমজানের মাসয়ালা-মাসায়েল ও ফজিলত শেখা ছিল তাঁদের নিয়মিত চর্চা। রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের রমজানের মর্যাদা বোঝাতে জান্নাতের ‘রাইয়ান’ দরজার সুসংবাদ দিতেন (বুখারি: ১৭৯৭) এবং জানাতেন যে, এ মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয় ও জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত থাকে—যা তাঁদের আমলের প্রতি আরও উৎসাহী করে তুলত।
রমজানে রাসুলুল্লাহ (স.) প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। সাহাবিরাও তাঁর অনুসরণে রমজানের আগেই দান-সদকার প্রস্তুতি নিতেন। অপচয়ের বদলে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁদের শিক্ষা। অনেকেই ফরজ জাকাত রমজানের আগেই হিসাব করে আদায় করে নিতেন, যাতে এ মাসে মানবিক কল্যাণে বেশি মনোযোগ দেওয়া যায়।
মুমিনের কাছে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ লাভের চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। কোরআনে আল্লাহ বলেন— ‘বলো, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক।’ (সুরা ইউনুস: ৫৮) । রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানের আগমনে অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করতেন এবং সাহাবিদের বলতেন—
‘তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে।’ (নাসায়ি: ২১০৬)
আমাদের করণীয়ঃ
সালাফে সালেহিনদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—
১. মানসিক প্রস্তুতি: দৃঢ় সংকল্প করা—এই রমজান হবে জীবনের সেরা রমজান।
২. কাজা আদায়: পূর্বের কোনো রোজা কাজা থাকলে শাবানেই তা আদায় করে নেওয়া। (বুখারি: ১৯৫০)
৩. কোরআনের অভ্যাস: এখন থেকেই তেলাওয়াতের ধারাবাহিকতা গড়ে তোলা।
৪. পরিবারকে যুক্ত করা: পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে রমজানের গুরুত্ব আলোচনা ও অপচয় পরিহারের অঙ্গীকার করা।
সাহাবিদের ইবাদতের একাগ্রতা ও রমজানের প্রতি তাঁদের ব্যাকুলতা যদি আমাদের হৃদয়ে সামান্য হলেও সঞ্চারিত হয়, তবেই আমাদের সিয়াম সাধনা সফল হবে। বাহ্যিক প্রস্তুতির চেয়ে আত্মিক প্রস্তুতিই মুমিনকে রমজানের প্রকৃত বরকত পৌঁছে দেয়। রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবিদের দেখানো এই পথই রমজানকে ফলপ্রসূ করার প্রকৃত দিশা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সে পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।







