মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে হঠাৎই প্লেব্যাক গান থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী অরিজিৎ সিং। মুহূর্তেই বিষয়টি ঘিরে ভক্তদের মধ্যে বিস্ময় ও কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ে, শুরু হয় তীব্র আলোচনা। তবে সেই ঘোষণার সঙ্গেই তিনি স্পষ্ট করে জানান, সংগীতের সঙ্গে তাঁর পথচলা থেমে যাচ্ছে না—একজন স্বাধীন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি কাজ চালিয়ে যাবেন।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—যে প্লেব্যাক গান তাঁকে দেশ–বিদেশে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে, মাত্র ৪০ বছর বয়সে সেখান থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন কেন অরিজিৎ সিং? এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ জানতে বিবিসি কথা বলেছে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে।
অনুরাগ বসুর ‘বারফি’, ‘জগ্গা জাসুস’, ‘লুডো’, ‘মেট্রো ইন দিনো’সহ একাধিক ছবিতে গান গেয়েছেন অরিজিৎ সিং। এসব ছবির অনেক গানই শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পরিচালক অনুরাগ বসু বিবিসিকে বলেন,
“সারা বিশ্বের মানুষ হয়তো এই সিদ্ধান্তে অবাক হতে পারে, কিন্তু তার সিদ্ধান্তে আমি মোটেই অবাক নই। আমি বহুদিন ধরেই জানি, অরিজিৎ কতটা প্রতিভাবান এবং গান ছাড়াও জীবনে সে আরও অনেক কিছু করতে চায়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি জানি, অরিজিৎ সিং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে ভীষণ আগ্রহী। এমনকি ‘বারফি’ সিনেমা বানানোর সময়ও অরিজিৎ আমাকে অনুরোধ করেছিল, সে আমার সহকারী হিসেবে কাজ করতে চায়। সে একটি স্কুল খুলতে চায় এবং শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। তার আরও অনেক পরিকল্পনা রয়েছে, যা আমাদের সামনে তার একেবারে ভিন্ন দিক তুলে ধরবে।”
চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন অধ্যায়
বিবিসি নিউজ নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছে, পরিচালক হিসেবে অরিজিৎ সিং তাঁর প্রথম হিন্দি ছবির কাজ শুরু করেছেন। জঙ্গল অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার এই ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। বর্তমানে ছবিটির শুটিং চলছে শান্তিনিকেতনে।
এই ছবির চিত্রনাট্য যৌথভাবে লিখেছেন অরিজিৎ সিং ও তাঁর স্ত্রী কোয়েল সিং। অনুরাগ বসুর ভাষায়, “চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পর্কে অরিজিতের গভীর ধারণা রয়েছে।”
ক্যারিয়ারের শুরুতে অরিজিৎ কিছুদিন কাজ করেছেন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক প্রীতমের সহকারী হিসেবে। সেই সময়েই তিনি সংগীতের নানা দিক হাতে-কলমে শিখে নেন। প্রীতমের সুরে ‘বারফি’, ‘ইয়ে জাওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’, ‘জগ্গা জাসুস’, ‘তামাশা’, ‘এ দিল হ্যায় মুশকিল’ ও ‘ব্রহ্মাস্ত্র’-এর মতো সুপারহিট ছবিতে গান গেয়ে এই জুটিকে বলিউডের অন্যতম সফল জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এ ছাড়া শঙ্কর–এহসান–লয়, বিশাল–শেখর, মিঠুন ও মন্টি শর্মার মতো সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
মুম্বাই নয়, মুর্শিদাবাদেই তাঁর জীবন
বলিউডে সাফল্যের শীর্ষে থেকেও অরিজিৎ সিং মুম্বাইয়ে স্থায়ী হননি। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদেই স্ত্রী কোয়েল ও দুই ছেলেকে নিয়ে তাঁর বসবাস। সেখান থেকেই তিনি নিজের গান, কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত সংস্থা এবং চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার কাজ সামলান।
মুর্শিদাবাদেই তিনি গড়ে তুলেছেন একটি আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিও, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে নিজের গান রেকর্ডিং ও কম্পোজিশনের কাজ করছেন। কিছুদিন আগে সেলিম–সুলেমান জুটি সেখানে গিয়ে অরিজিতের কণ্ঠে একটি গান রেকর্ড করেন।
সুলেমান বলেন,
“চলচ্চিত্র নির্মাণ অরিজিতের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন, যেটার ওপর সে এখন পুরোপুরি মনোযোগ দিতে চায়। সে ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ, আর আমি তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।”
সত্যজিৎ রায় থেকে অনুপ্রেরণা
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র অরিজিৎ সিংকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কয়েক বছর আগে তিনি তাঁর সংগীতগুরু রাজেন্দ্র প্রসাদ হাজারীর জীবন নিয়ে একটি বাংলা ছবি প্রযোজনা ও পরিচালনাও করেন।
অরিজিৎ সিংয়ের পারিবারিক বন্ধু ও মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা অনিলাভ চট্টোপাধ্যায় জানান,
“এই মুহূর্তে অরিজিৎ একটি হিন্দি ও একটি বাংলা ছবি নিয়ে ব্যস্ত এবং দুটি ছবির শুটিংই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় চলছে।”
তিনি আরও বলেন, অরিজিৎ যেমন আবেগী কণ্ঠশিল্পী, তেমনি উদার মনের মানুষ। স্থানীয় পর্যায়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে তিনি নিয়মিতই দাঁড়ান।
রিয়েলিটি শো থেকে জাতীয় পুরস্কার
২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রিয়েলিটি শো ‘ফেম গুরুকুল’-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে অরিজিতের সংগীতযাত্রা শুরু। শোটির বিচারক ছিলেন জাভেদ আখতার, শঙ্কর মহাদেবন ও কে কে। প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ার সময় জাভেদ আখতার তাঁকে বলেছিলেন,
“এতে তোমার ক্ষতি কমই হলো, ক্ষতিটা বেশি হলো এই শো-এর।”
২০১১ সালে ‘মার্ডার টু’ ছবির ‘ফির মোহাব্বত’ গান তাঁকে বলিউডে বড় সুযোগ এনে দেয়। এরপর ২০১৩ সালে ‘আশিকি টু’-এর ‘তুম হি হো’ গান অরিজিতকে শীর্ষ কণ্ঠশিল্পীদের কাতারে তুলে ধরে।
‘ফির মোহাব্বত’, ‘তুম হি হো’, ‘বিনতে দিল’, ‘চান্না মেরেয়া’, ‘কালঙ্ক’, ‘কেসারিয়া’, ‘কাভি জো বাদল বারসে’-সহ একের পর এক জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি। ইউটিউব, স্পটিফাই ও ইনস্টাগ্রাম রিলসে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি শোনা শিল্পীদের একজন।
দু’বার জাতীয় পুরস্কার ও আটবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন অরিজিৎ সিং। ২০২৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
২০১৮ সালে ‘পদ্মাবতী’ ছবির ‘বিনতে দিল’ গানের জন্য তিনি প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান। ২০২২ সালে ‘ব্রহ্মাস্ত্র’-এর ‘কেসারিয়া’ গানের জন্য আসে দ্বিতীয় জাতীয় স্বীকৃতি।
প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেও, নতুন সৃষ্টিশীল অভিযাত্রায় অরিজিৎ সিং যে আরও ভিন্ন রূপে হাজির হতে চলেছেন—সে ইঙ্গিতই মিলছে তাঁর এই সিদ্ধান্তে।







