আর্কাইভ
ads
logo

বিদেশি আইনজীবী পরামর্শ: আদানি চুক্তি বাতিল না করলে বাংলাদেশের আইনি অবস্থান দুর্বল হবে

অর্থনীতি ডেস্ক

প্রকাশকাল: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৮ এ.এম
বিদেশি আইনজীবী পরামর্শ: আদানি চুক্তি বাতিল না করলে বাংলাদেশের আইনি অবস্থান দুর্বল হবে

ads

বিদেশি আইনি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারকে বিতর্কিত আদানি পাওয়ার চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের সতর্কবার্তা—যদি এই বিষয়ে আরও বিলম্ব হয়, তবে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে (এসআইএসি) সম্ভাব্য সালিশি মামলায় বাংলাদেশের অবস্থান গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র ও জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি)-এর একাধিক সদস্য ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-কে জানিয়েছেন, কমিটির সংগ্রহ করা প্রমাণ পর্যালোচনার পর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই এই পরামর্শ দেন জ্যেষ্ঠ বিদেশি আইনজীবীরা। এদের মধ্যে রয়েছেন কিংস কাউন্সেল ফারহাজ খান।

কমিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল উদ্বেগের বিষয় হলো—দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এক কর্মকর্তা বলেন, "কোনো পক্ষ যদি ঘুষ বা জালিয়াতির শক্ত প্রমাণ থাকার দাবি করেও দীর্ঘসময় চুক্তি কার্যকর রাখতে থাকে এবং পরে আইনি প্রতিকার চায়, তাহলে সালিশকারীরা এটিকে স্ববিরোধী আচরণ হিসেবে দেখাতে পারেন। এতে মনে হতে পারে, সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজেই তার প্রমাণ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল না।"

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা আরও বলেন, ইংরেজ আইন অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়াকে চুক্তির নীরব স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও এনআরসি সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান জানিয়েছেন, "আদানি চুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের কাছে জালিয়াতি তদন্ত শুরির মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই আইনি বিশেষজ্ঞরা সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন।"

সরকার পরিবর্তনের পর আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎখাতের বড় চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি) গঠন করা হয়েছিল, যার মধ্যে আদানি চুক্তি সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে রয়েছে।

এনআরসি সদস্যরা জানিয়েছেন, ফারহাজ খানসহ বিদেশি আইনজীবীদের মতামত ‘লিগ্যাল প্রফেশনাল প্রিভিলেজ’-এর আওতায় সুরক্ষিত। একজন সদস্য বলেন, "কিংস কাউন্সেলের পরামর্শ সরকারকে দেওয়া হয়েছে, এটি জনসমক্ষে প্রকাশের বিষয় নয়।" ইংরেজ আইনে আইনজীবী ও মক্কেলের মধ্যে গোপন যোগাযোগ প্রকাশের বাইরে রাখার বিধান রয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, পরামর্শের মূল দিকনির্দেশনা স্পষ্ট—চুক্তি বাতিলের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

কর্মকর্তারা আরও সতর্ক করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ‘এস্টপেল’ নীতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, "প্রকাশ্যে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আবার বিদ্যুৎ নেওয়া চালিয়ে গেলে মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়। আদানির আইনজীবীরা বলতে পারেন—বাংলাদেশ তার আচরণের মাধ্যমে চুক্তি মেনে নিয়েছে।"

আইনি পরামর্শকরা ইংরেজ আইনের ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ নীতির কথাও উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ—দুর্নীতিতে কলুষিত চুক্তি শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য। অধ্যাপক মোশতাক বলেন, "যদি কোনো চুক্তি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য। কিন্তু কোনো পক্ষ যদি দুর্নীতির কথা জেনেও চুক্তি চালিয়ে যায়, তাহলে সেটিকে চুক্তি বহাল রাখার সম্মতি হিসেবে ধরা হতে পারে।"

এনআরসি চুক্তি সংক্রান্ত তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কমিটির তথ্যমতে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ইতোমধ্যেই দেশ ছেড়েছেন। যারা দেশে আছেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

অধ্যাপক মোশতাক জানিয়েছেন, "আমরা আইনি বিশেষজ্ঞ, হুইসেলব্লোয়ার ও বেসরকারি তদন্তকারীদের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। তাদের সবাই নিশ্চিত করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগে দেওয়ানি মামলা করার মতো যথেষ্ট উপাদান আমাদের হাতে রয়েছে।"

২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় ২০২৩ সালে। শুরু থেকেই চুক্তির মূল্য কাঠামো, কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দরপত্রের অভাব নিয়ে সমালোচনা চলেছে। বিশেষজ্ঞ ও এনআরসি সদস্যদের মতে, অন্য কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের তুলনায় বাংলাদেশ এখানে চড়া বিদ্যুতের দাম দিচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ভোক্তাদের বিদ্যুৎ মূল্যে চাপ সৃষ্টি করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরবর্তী সরকার যদি আইনি পরামর্শ অনুযায়ী চুক্তি বাতিল করে, তাহলে আদানি আপত্তি জানালে বাংলাদেশ সালিশি প্রক্রিয়ায় যাবে। অধ্যাপক মোশতাক হোসেন বলেন, "চুক্তি বাতিলের পরই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিশ প্রক্রিয়া শুরু করব।"

অন্যদিকে, আদানি পাওয়ার ফাইভডব্লিউ কমিউনিকেশন্সের মাধ্যমে ই-মেইলে জানায়, তারা এই ধরনের কোনো আইনি পরামর্শের বিষয়ে অবগত নয় এবং বিপিডিবির পক্ষ থেকেও তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। তবে তারা বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব অব্যাহত রাখবে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

ads

এই বিভাগের আরও খবর

এই বিভাগের আরও খবর

ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ