বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত রেমিট্যান্স এখন ক্রমেই সরে যাচ্ছে বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে। ব্যাংকের কাউন্টার পেরিয়ে নয়, বরং অলিগলি, মোবাইল ফোন ও গোপন এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের প্রবাসী আয় দেশে প্রবেশ করছে—যা গড়ে তুলেছে এক শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক হুন্ডি সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান, জর্ডান, ইরাক, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ প্রবাসী অধ্যুষিত প্রায় সব দেশেই এই অবৈধ নেটওয়ার্ক সক্রিয়। এর মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র দুবাই, আর পরিচালনায় রয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সংগঠিত অপরাধচক্র। হাজার হাজার সাব-এজেন্ট, মানি ট্রান্সফার হাউজ, স্বর্ণ ব্যবসা ও খুচরা বাণিজ্যের আড়ালে চলছে একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ফলে সরকার বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে প্রণোদনা দিলেও বড় অঙ্কের ডলার হারিয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য রুটে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ব্যাংকের তুলনায় সামান্য বেশি রেট দিয়ে হুন্ডি সিন্ডিকেট প্রবাসীদের আকৃষ্ট করছে। এতে প্রবাসী শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এমনকি স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও দ্রুত ও ঝামেলাহীন লেনদেনের আশায় ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে হুন্ডির দিকে ঝুঁকছেন।
তিন স্তরে হুন্ডি কার্যক্রম
হুন্ডি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে তিনটি পদ্ধতিতে—
১) মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি),
২) তফসিলি ব্যাংকে প্রক্সি জমা,
৩) হাতে হাতে নগদ লেনদেন।
অভিযোগ রয়েছে, যাঁদের এই অবৈধ কর্মকাণ্ড ঠেকানোর কথা, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে কার্যকর আইন প্রয়োগের বদলে নীরব যোগসাজশ তৈরি হচ্ছে।
দুবাইয়ের ‘গোপন সাম্রাজ্য’
কুয়েতভিত্তিক কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের হুন্ডি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় দুবাই থেকে। গ্রোসারি দোকান থেকে প্রাইভেট মেডিক্যাল সেন্টার পর্যন্ত বহু ব্যবসা ভারতীয় মাফিয়া সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের বড় অংশই হুন্ডির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এক ব্যবসায়ী বলেন, “দুবাই এখন ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ীদের অঘোষিত স্টেট। সেখান থেকেই রেট ঠিক হয়, টাকা ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ হয়।”
তারা জানান, প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যবহার করে অবৈধভাবে স্বর্ণ বহনের মাধ্যমেও অর্থ পাচার চলছে। ১০০ গ্রাম স্বর্ণ হাতে দিয়ে পাঠানো হলেও এর আড়ালে বহুগুণ বেশি স্বর্ণ অবৈধভাবে প্রবেশ করছে।
কুয়েত ও কাতারভিত্তিক ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, “দুবাইতে বসেই ঠিক হয়– আজ ১ দিনারে কত টাকা দেয়া হবে। ভারতীয় সিন্ডিকেটের কয়েকজন বড় খেলোয়াড় পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।”
কুয়েতের চিত্র: হুন্ডির দখলে লেনদেন
স্থানীয় সূত্র জানায়, ব্যাংকে যেখানে ১ দিনার = ৪০০ টাকা, সেখানে হুন্ডি দিচ্ছে ৪০২–৪০৩ টাকা। এই সামান্য ব্যবধানেই প্রবাসীরা ব্যাংক এড়িয়ে হুন্ডিতে ঝুঁকছেন। এজেন্টরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে বাড়ি পর্যন্ত টাকা পৌঁছে দিচ্ছে।
তাদের দাবি, “কুয়েত থেকে মাত্র ৫ শতাংশ টাকা ব্যাংকে যাচ্ছে, বাকিটা মোবাইলের সিক্রেট নম্বর দিয়ে।” যদিও সাম্প্রতিক কঠোর নজরদারিতে এখন প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে যাচ্ছে বলেও তারা জানান।
‘শ্যাডো ব্যাংকিং’-এ রূপ নিচ্ছে হুন্ডি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আধুনিক হুন্ডি এখন চার ধাপে কাজ করে—
প্রবাসী স্থানীয় এজেন্টকে টাকা দেয় → এজেন্ট ফোন বা অ্যাপের মাধ্যমে দেশে নির্দেশ পাঠায় → সহযোগী নেটওয়ার্ক নগদ পৌঁছে দেয় → বিদেশে ব্যবসা, স্বর্ণ বা পণ্য বাণিজ্যের মাধ্যমে হিসাব সমন্বয় হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি এক ধরনের “শ্যাডো ব্যাংকিং সিস্টেম”।
কেন পিছিয়ে পড়ছে ব্যাংকিং চ্যানেল
বিশ্লেষকদের মতে, কম প্রণোদনা (২.৫%), ধীর প্রক্রিয়া, অতিরিক্ত কাগজপত্র, সীমিত গ্রাহকসেবা ও প্রবাসীবান্ধব প্যাকেজের অভাব ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। বিপরীতে হুন্ডি দিচ্ছে বেশি রেট, তাৎক্ষণিক সেবা ও বাড়িতে ডেলিভারি।
এক প্রবাসীর ভাষায়, “ব্যাংকে লাইনে দাঁড়ানোর চেয়ে ফোন দিলেই টাকা পৌঁছে যায়।”
মালয়েশিয়া ও কাতারেও একই চিত্র
মালয়েশিয়া থেকে এক ব্যবসায়ী জানান, ব্যাংকের চেয়ে ২০–৩০ পয়সা বেশি রেটে হুন্ডি চলছে। তিনি বলেন, “৫ লাখের বেশি কর্মী ভিসা কেনাবেচা হয়েছে। প্রায় সব টাকাই হুন্ডিতে গেছে। সরকার কি জানে না কারা পাঠাচ্ছে?”
কাতারপ্রবাসী এক বাংলাদেশির মন্তব্য, “সৎ লোক না বসালে কিছুই বদলাবে না। ভালো লোক বসাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি থাকলে হুন্ডি এত বাড়ত না।”
কত অর্থ হারাচ্ছে বাংলাদেশ?
সরকারি সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকলেও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, মোট রেমিট্যান্সের ৩০–৪০ শতাংশ যদি হুন্ডিতে যায়, তবে বছরে ৮–১২ বিলিয়ন ডলার বৈধ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে রিজার্ভ কমছে, ডলার সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, দুর্বল হচ্ছে ব্যাংকিং খাত।
প্রণোদনা বাড়ানোর প্রস্তাব
বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, “বিদেশগামী কর্মীদের বৈধভাবে অন্তত ৩০০ ডলার বহনের সুযোগ দিলে হুন্ডির প্রয়োজন কমবে। ব্যাংকগুলোকে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দিতে হবে, না হলে মানুষ বিকল্প পথ খুঁজবে।”
সামনে চ্যালেঞ্জ
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে এসেছে ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা টাকায় প্রায় ৩৮ হাজার ৬৭৪ কোটি—একক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে এই অঙ্ক আরও অনেক বেশি হতে পারত।
হুন্ডি এখন আর ছোটখাটো অবৈধ লেনদেন নয়; এটি দুবাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট পরিচালিত এক সমান্তরাল আর্থিক ব্যবস্থা। প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি এই অদৃশ্য অর্থপ্রবাহকে বৈধ ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারবে, নাকি কোটি কোটি ডলার হারিয়ে যাবে অদৃশ্য পথেই?







