ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার নজর কেড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এআই তৈরি ভিডিও ও কনটেন্টের মাধ্যমে নিজেদের প্রচার চালাচ্ছে, আবার প্রতিপক্ষের প্রতি নেতিবাচক প্রচারণাও হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই নির্বাচনী আচরণবিধিতে এআই সম্পর্কিত নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করেছে। নির্বাচনের দিন যত কাছে আসছে, সামাজিক মাধ্যমে এআই ভিডিওর অল্প তথ্য বা ভুল প্রাসঙ্গিকতা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উৎকণ্ঠা তৈরি করছে। ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে জনমনে উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে।
নির্দিষ্ট দল সমর্থনে এআই ভিডিও:
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমানের সমর্থন প্রেরণের নামে এআই নির্মিত ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো এই ভিডিওতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, ফেসবুকে ২০ লাখের বেশি মানুষ এটি দেখেছে। একই ধরনের অনেক ভিডিও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে প্রতিটি ভিডিওর ভিউ লাখ ছাড়িয়েছে।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা:
নির্বাচনের সময় সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব বাড়ায় বিভ্রান্তিমূলক ভিডিও সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষভাবে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে পরিকল্পিত কনটেন্ট তৈরি ও ছড়ানো হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব জানায়, জানুয়ারির প্রথম ১৫ দিনে ৮০০টির বেশি এআই নির্মিত ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
নির্বাচনী আইন:
নির্বাচনী আচরণবিধির ১৬(ছ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রার্থী ভোটারকে বিভ্রান্ত করার জন্য বা কারো সুনামহানি করতে সামাজিক মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করতে পারবে না।
তবে আচরণবিধি অনুযায়ী, শুধুমাত্র দলের সমর্থনে নির্মিত এআই ভিডিও প্রচারে কোনো বাধা নেই। মূল সমস্যা হচ্ছে, আক্রমণাত্মক ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা, যা আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “নির্বাচনের উদ্দেশ্যে তৈরি এআই ভিডিওর মধ্যে প্রচারণামূলক থেকে আক্রমণাত্মক, ষড়যন্ত্রমূলক ও বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট আছে। অনেক ভিডিও দলের পক্ষে, অনেক ভিডিও বিপক্ষকে হেয় করার জন্য তৈরি হয়েছে। এ ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার স্বচ্ছতা নেই, যা সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হচ্ছে।”
ভিডিও যাচাই ও বোঝার কৌশল:
গবেষকরা বলছেন, এআই ভিডিও বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো পিকচার কোয়ালিটি যাচাই করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিডিও ব্লারি বা অস্পষ্ট হয়। অনেক ভিডিও দূর থেকে তোলা বা সিসিটিভি ফুটেজ বলে চালানো হয়। নির্বাচনে ভাইরাল হওয়া এআই ভিডিওর ৯০ শতাংশই সিসিটিভি ফুটেজ বলে প্রচারিত হয়েছে।
ফ্যাক্ট চেকের প্রক্রিয়া:
যে কোনো এআই ভিডিও যাচাই করতে গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ, টিনআই, ফটোফরেনসিকস, জিওলোকেশন টুল এবং ইউটিউব ডেটাভিউয়ার বা ইনসিভ ব্যবহার করা যেতে পারে। ভিডিওটি কখন, কোথায় এবং কোন উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে, তা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভোটারদের অবশ্যই যৌক্তিক বিচার-বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে ভিডিও গ্রহণ করতে হবে। অনেক ভিডিওতে লক্ষ্য করা যায়, প্রচলিত তথ্যের সাথে বিরোধপূর্ণ বা অস্পষ্ট উপাদান রয়েছে, যা অতি দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে না।
এভাবে এআই প্রযুক্তি নির্বাচনী প্রচারে নতুন সম্ভাবনা আনলেও, একই সঙ্গে ভোটার বিভ্রান্তি ও ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার ঝুঁকিও বৃদ্ধি করছে।







