আর্কাইভ
ads
logo

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা বাস্তবসম্ভব?

ফাহিমা

প্রকাশকাল: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১৮ এ.এম
নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা বাস্তবসম্ভব?

ads

নারীদের কর্মজীবন নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। একদিকে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের ভূমিকা সীমিত করার প্রবণতাও স্পষ্ট। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও এটি দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়নি, তবে তাঁর বক্তব্যে বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।

এই প্রস্তাব অনুযায়ী, বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েদের জন্য দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করার কথা বলা হয়েছে। তবে বেতন থাকবে পুরো আট ঘণ্টার সমান। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ ঘণ্টার বেতন দেবেন নিয়োগকর্তা এবং বাকি অংশ সরকার বহন করবে। প্রস্তাবটির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণের আগে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আট ঘণ্টার কর্মদিবস নীতিই এখনো বাংলাদেশে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর এই ধারণাকে কেউ কেউ নারীর সুরক্ষা ও পরিবারকেন্দ্রিক ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। আবার সমালোচকদের মতে, এটি পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ, যা নারীদের কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা

বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত অর্থনীতিতে নারীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী, যাদের বড় একটি অংশ তৈরি পোশাক, কৃষি ও অন্যান্য শ্রমঘন খাতে যুক্ত। পরিবারের আয় বাড়াতে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে অনেক নারী নিয়মিত ওভারটাইম করেও কাজ করেন।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার (লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট) ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮০ দশমিক ৯ শতাংশ। যদিও নারীদের অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় অনেক কম, তবে গত তিন দশকে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৯০ সালে নারীদের এলএফপিআর ছিল মাত্র ২৪ শতাংশ।

তৈরি পোশাক খাতেই নারীদের সবচেয়ে বড় অবদান। বিজিএমইএ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই খাতে নারী শ্রমিকের হার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে। কম মজুরির কারণে অনেক নারী বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করেন, যা তাদের আয়ের একটি বড় উৎস।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের জরিপ বলছে, কর্মরত নারীদের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে কাজ সাধারণত মৌসুমনির্ভর, অনিরাপদ এবং কম মজুরির। গ্রামীণ এলাকায় নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৫১ শতাংশ (২০২২), যা শহরের তুলনায় বেশি। এসব নারী কৃষি, গৃহকর্ম ও ক্ষুদ্র শিল্পে যুক্ত থেকে সরাসরি জিডিপিতে অবদান রাখছেন।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়লে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক রীতি ও কাঠামো এখনো নারীদের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ৩৭ শতাংশ গৃহস্থালী কাজে যুক্ত, যা পুরুষদের তুলনায় ১৪ শতাংশের বেশি। এর পাশাপাশি নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিট বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজ ও পরিবারের যত্নে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সময় মাত্র ১ ঘণ্টা ২৩ মিনিট। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার ধারণা অনুযায়ী, এই অদৃশ্য শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হলে তা জিডিপির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের সমান হতে পারে।

প্রস্তাবটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি পড়তে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে।

প্রথমত, সরকার যদি বাজেট সংকটের কারণে বেতনের অতিরিক্ত অংশ বহন করতে না পারে, তাহলে নারীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। বাংলাদেশে এমনিতেই নারী–পুরুষ মজুরি বৈষম্য ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। ওভারটাইম অনেক নারীর জন্য অতিরিক্ত আয়ের প্রধান উৎস।

কর্মঘণ্টা কমে গেলে পারিবারিক আয় হ্রাস পেতে পারে, যা দারিদ্র্য বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের এক অনুমান অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার পুরুষদের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।

দ্বিতীয়ত, এই প্রস্তাব নারীদের শুধু মাতৃত্বের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করে দেখার প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, যা তাদের পেশাগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

তৃতীয়ত, নিয়োগকর্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। তৈরি পোশাকের মতো উৎপাদননির্ভর খাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয়। পাঁচ ঘণ্টার কর্মদিবস কার্যকর হলে নতুন শিফট চালু করতে হবে, যা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করবে। এর ফল হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান নারী কর্মী নিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারে, যা বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে

বিশ্বজুড়ে কেবল নারীদের জন্য আলাদা করে কর্মঘণ্টা কমানোর নজির খুবই সীমিত, কারণ আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটিকে বৈষম্যমূলক হিসেবে দেখা হয়। তবে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নমনীয় কর্মব্যবস্থা—যেমন সংক্ষিপ্ত কর্মসপ্তাহ বা রিমোট ওয়ার্ক—অনেক দেশেই সফলভাবে চালু আছে।

নেদারল্যান্ডসে গড় সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা মাত্র ২৯ ঘণ্টা। আইসল্যান্ডে ২০২২ সাল থেকে ৫১ শতাংশ কর্মী চারদিনের কর্মসপ্তাহে কাজ করছেন, যেখানে উৎপাদনশীলতা কমেনি। জাপানের টোকিওতে ২০২৫ সাল থেকে সরকারি কর্মচারীরা চারদিনের কর্মসপ্তাহ পাচ্ছেন। ফ্রান্স ও ডেনমার্কে সাধারণভাবে সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৩৯ ঘণ্টা কাজ প্রচলিত।

ইতিহাসে অবশ্য উনবিংশ ও বিংশ শতকের শুরুর দিকে নারীদের জন্য আলাদা কর্মঘণ্টা নির্ধারণের আইন ছিল, যেগুলো ‘প্রোটেকটিভ লেজিসলেশন’ নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যের ১৮৪৭ সালের ‘টেন আওয়ার্স অ্যাক্ট’, ফ্রান্সের ১৮৯২ সালের নাইট ওয়ার্ক নিষেধাজ্ঞা কিংবা বুলগেরিয়ার ১৯০৫ সালের আইন—সবই নারীর সুরক্ষার যুক্তিতে চালু হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এগুলোকে লিঙ্গ বৈষম্যমূলক হিসেবে বিবেচনা করে অনেক দেশ আইন সংশোধন বা বাতিল করেছে।

আধুনিক সময়ে আইএলও ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সংস্থাগুলো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নীতি—যেমন প্যারেন্টাল লিভ, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও নমনীয় কর্মব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে।

সব দিক বিবেচনায়, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উন্নত অভিজ্ঞতা বলছে, লিঙ্গভিত্তিক সীমাবদ্ধতার বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নমনীয় কর্মনীতিই টেকসই সমাধান হতে পারে।

ads

এই বিভাগের আরও খবর

ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ