আর্কাইভ
ads
logo

আদানির সঙ্গে বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তি বহাল রাখবে বিএনপি সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশকাল: ১ মার্চ ২০২৬, ০২:৪১ পি.এম
আদানির সঙ্গে বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তি বহাল রাখবে বিএনপি সরকার

ads

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, এই চুক্তি বাতিল করার কোনো উদ্যোগ সরকারের নেই।

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে। শুরু থেকেই চুক্তিটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, জ্বালানি বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদদের অনেকে এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এটিকে দেশের জন্য আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন। বিএনপির একাধিক নেতা এটিকে একপাক্ষিক চুক্তি বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন।

তবে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার তুলনামূলক সতর্ক ও সংযত অবস্থান নিয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “আদানি চুক্তি বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। তবে কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা করা হতে পারে, যাতে শর্তগুলো ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়।”

 আমদানি-নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ২,৩০০ থেকে ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়, যা মোট সরবরাহের প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ।

আমদানিকৃত বিদ্যুতের বড় অংশ আসে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে, যা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে আদানি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের গড় বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৪,০০০ মেগাওয়াট হওয়ায়, মোট ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশই আসছে এই উৎস থেকে। এছাড়া সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মাধ্যমে মোট আমদানি সক্ষমতা ২,৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।

খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষ করে উচ্চ চাহিদার সময় আমদানিকৃত বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। তবে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে।

বিতর্কিত একটি চুক্তি

২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেডের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।

চুক্তির মূল্য কাঠামো, কয়লা সরবরাহ পদ্ধতি এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি শুরু থেকেই সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যান্য কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের তুলনায় এখানে বিদ্যুতের দাম বেশি, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ভোক্তা পর্যায়ের বিদ্যুৎ মূল্যের ওপর চাপ তৈরি করছে।

চুক্তির সমস্যা কোথায়?

আদানির সঙ্গে বিপিডিবির ২৫ বছরের চুক্তি বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ খাতের প্রকৌশলীরা কয়েকটি ঝুঁকির দিক চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, চুক্তি প্রণয়নের সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে চাপের প্রভাব থাকতে পারে।

চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করা হবে। তবে কয়লা আমদানির পদ্ধতিতে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি দেখানোর সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পায়রা, রামপাল ও এস আলম বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানিকৃত কয়লার দামের সঙ্গে তুলনা করে বিপিডিবি আদানির ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধিতে আপত্তি জানায়। বর্তমান চুক্তিতে ইন্দোনেশিয়ার ইনডেক্স এবং অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল ইনডেক্সের গড় দামের ভিত্তিতে কয়লার মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন,
“দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে কেউ কখনো এত দাম দিয়ে কয়লা কেনে না। আমরা সেটা পায়রার ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি ,আমরা রামপাল এবং এস আলম তিনটা ক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি। আমি মনে করি আমাদের একটা বড় ভুল হয়ে গেছে । এটা আরো স্পেসিফিক হওয়া উচিৎ ছিল এবং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ব্যাপারটা ওখানে উল্লেখ করা দরকার ছিল।"

"কিন্তু সেটা খুব সিম্পল ভাষায় নিউক্যাসলের কয়লা ধরে আমাদের এই চুক্তিটা করা হয়েছে। এটা একটা বড় ধরনের ভুল হয়েছে। বাট দ্যাট ওয়াজ ও মিসটেক ডান ইন গুড ফেইথ। সেটা যদি আমরা চিন্তা করি সেটা কোনো অবস্থায় বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে আমি মনে করি।”

 আদানিকে বাড়তি সুবিধা?

সমালোচকদের মতে, বিনা দরপত্রে সরাসরি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই চুক্তি হওয়ায় এতে আদানির জন্য বাড়তি মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমদানি করা কয়লার মূল্য নির্ধারণ, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং উৎপাদন ব্যয়ের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

প্রকৌশলীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির কিছু ধারায় কয়লার মানের সঙ্গে মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর অনুযায়ী হিট রেট ২৩৯৬ থেকে ২৬৯৩ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের অন্যান্য আমদানি-নির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বেশি। ফলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি কয়লা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

এছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ থাকলেও তার আর্থিক সুবিধা বিপিডিবি পাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদন ক্ষমতার অন্তত ৩৪ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রহণ না করলেও কয়লার মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বিপিডিবির ওপর—যা অন্য আমদানি-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে নেই।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব শর্তে বাংলাদেশের স্বার্থ পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়নি। ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও এখনো অস্পষ্টতা ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ads

এই বিভাগের আরও খবর

ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ