আর্কাইভ
ads
logo

বাংলাদেশের নির্বাচন: সেনাবাহিনী কি এখনও পর্দার আড়ালে একটি শক্তি?

দ্যা ভয়েস২৪ ডেস্ক

প্রকাশকাল: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৩ পি.এম
বাংলাদেশের নির্বাচন: সেনাবাহিনী কি এখনও পর্দার আড়ালে একটি শক্তি?

ads

ঢাকার রাজনৈতিক আলোচনায়, দেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা নিয়ে বিতর্কের সময় প্রায়শই একটি শব্দ বারবার ওঠে আসে আর তা হলো "কচুক্ষেত"। সাম্প্রতিক সময়ে নাগরিকদের বিতর্কে রাজনীতিসহ যেকোনো বেসামরিক বিষয়েও সেনানিবাসের প্রভাবের বিষয়টি রূপক হিসেবে এই শব্দটি উঠে আসে হরহামেশাই।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর এবং নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রথম নির্বাচন।  

সেনাবাহিনী নির্বাচনী ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। কিন্তু জনশৃঙ্খলা তথা ভোটদানের পরিবেশের ক্ষেত্রে তারা এখন মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের সেই টালমাটাল পরিস্থিতির পর পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা এখনো দুর্বল থাকায় জনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দৃশ্যমান রক্ষাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেনাবাহিনী। তবুও বাংলাদেশকে এখনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে হিসেব-নিকেশ করতে হচ্ছে কারণ মানবাধিকার সংস্থা এবং সরকারি তদন্তকারীদের মতে হাসিনার  শাসন আমলে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছিল রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণের জন্য।

প্রায় দেড় বছর ধরে, বাংলাদেশের রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে সেনাবাহিনী। একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি এ ক্ষমতা দেওয়া হয়। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য, সৈন্য মোতায়েন আরও বাড়ানো হবে। কর্মকর্তারা বলেছেন যে দেশব্যাপী প্রায় ১,০০,০০০ সৈন্য মোতায়েন করা হবে এবং নির্বাচনী বিধিমালায় প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে সশস্ত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের "আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা"-র তালিকাভুক্ত হবে।

ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে অবস্থিত ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ বারবার এমন সব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে, যা অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসনের মাধ্যমে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। সেই অতীত আজও বাংলাদেশিদের বর্তমানকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী আজ সরাসরি ক্ষমতা দখলের অবস্থানে নেই ঠিকই, কিন্তু তারা এখনো একটি নির্ণায়ক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও সরকারের ভেতরে উপস্থিতির মাধ্যমে বেসামরিক সিদ্ধান্তের পথকে সংকীর্ণ করতে সক্ষম।

এখন সেনাবাহিনীর ভূমিকা

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিষয়ক সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিন বলেন, সেনাবাহিনী কেবল রাজনৈতিকভাবেই নয়, বরং পুলিশের দুর্বলতার মধ্যে দৈনন্দিন নিরাপত্তার মাধ্যমেও অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন যে,  সেনাবাহিনী একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর দেখতে চায়, যাতে দেশ একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর ফিরে আসে এবং সেনারা ব্যারাকে ফিরে যেতে পারে।

 আল জাজিরাকে কিন বলেন, “সেনাবাহিনীর ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন দল এবং ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে আমি বলব যে, সেনাবাহিনী নির্বাচনটি যতটা সম্ভব ভালোভাবে সম্পন্ন হতে দেখতে চায়।”

কিন যুক্তি দেখান যে, যদি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে চাইত, তবে ৫ আগস্ট যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, যেদিন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলে্‌ তখনই তারা তা করতে পারত।। কিন্তু সামরিক বাহিনী তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ হিসেবে ওয়াকার-উজ-জামান মনে করেন, অতীতে সরাসরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেনাবাহিনী করেছিল, তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে সচেতন যে ক্ষমতা দখল তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, যা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আর্থিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা উভয়ই বহন করে। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ জনবল সরবরাহকারী দেশ। এই সেবার বিনিময়ে সেনাবাহিনী প্রতি বছর ১০০ মিলিয়ন থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ ও সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন বাবদ পেয়ে থাকে।

শাহান বলেন, সামরিক বাহিনী এখনও দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আছে। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্তমানে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপের বদলে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব প্রয়োগে বেশি নির্ভর করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান সামরিক বাহিনীর করপোরেট কার্যক্রমের বিস্তৃত দিকের ওপরও আলোকপাত করেন। তার মতে, এই প্রভাব শুধু বড় রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো প্রকল্পে অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামরিক বাহিনীর নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক ও সরকারি সংস্থায় কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।

শাহান উল্লেখ করেন, হাসিনার পূর্ববর্তী সরকার বাহিনীকে কিছু সুবিধা প্রদান করেছিল, যা প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে এক ধরনের দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। তার ধারণা, এটি পরবর্তী সরকারের ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি করতে পারে যেন তারা একই ধারা বজায় রাখে। এছাড়া, বাহিনীর ভেতরে একটা উদ্বেগও থাকতে পারে যে তাদের অর্জিত সুবিধা ও অধিকার সংকুচিত হতে পারে কি না।

নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে শাহান মনে করেন, সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণের সম্ভাবনা খুব কম। তবে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটলে এবং জনতার দাবি সৃষ্ট হলে তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে, কারণ তখন বাহিনীকে স্থিতিশীলতার একমাত্র উৎস হিসেবে দেখা হবে।

সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা অন্য বিশ্লেষকরাও এই মতের সাথে একমত। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বেস্টসেলার বই ‘কমান্ডো’-এর লেখক রাজিব হোসেন বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সেনাবাহিনী নিজেদের স্বার্থে কোনো দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়াবে না। এই নির্বাচনে তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখবে। গত দেড় বছরে মাঠ পর্যায়ে যা আমরা দেখেছি, তাতে সেনাবাহিনী কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করেছে এমন কোনো রেকর্ড নেই।”

তবে তিনি যোগ করেন, ২০২৪ সাল থেকে বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ বিরাজ করছে। তিনি বলেন, বাহিনীর অভ্যন্তরে একটি ধারণা কাজ করছে যে, যদি তারা নিরপেক্ষ থাকতে ব্যর্থ হয়, তবে বাকি থাকা জনআস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল রুশো আল জাজিরা বলেন, সামরিক বাহিনীর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নয়, তবে এটি এখনো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

রুশো উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় এই প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যবেক্ষক সেনাবাহিনীর অবস্থানকে নির্ণায়ক হিসেবে দেখেছিলেন। যদি বাহিনী তখন নিরপেক্ষ অবস্থান না নিত, তবে আরও বড় রক্তপাত ঘটত।

আন্দোলন তীব্র হওয়ার সময় সেনাবাহিনী হাসিনার জারি করা কারফিউ কমিশনের আদেশ পুরোপুরি কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালানোর থেকে বিরত থাকে। এই সিদ্ধান্ত হাসিনাকে বিমানবাহিনীর মাধ্যমে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে এবং পরবর্তীতে সেনাপ্রধান একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই মাসেরও কম সময় আগে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

গত বছর আল জাজিরার তৈরি তথ্যচিত্রে ওয়াকার বলেন, “আমরা বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালাই না। এটি আমাদের সংস্কৃতিতে নেই… তাই আমরা হস্তক্ষেপ করিনি।” তিনি আরও বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়… এটি আমাদের কাজ নয়।”

যখন সামরিক শাসন আমল ছিলো

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা সবসময় স্থির ছিল না। ১৯৭৫ সালে দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার পর দেশে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসনের এক বিশৃঙ্খল সময় শুরু হয়। এই সময়কালে রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠন হয় এবং এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হয়, যারা আজও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে বেসামরিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে তিনি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৮১ সালে আরেকদল সেনা কর্মকর্তার ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় জিয়াউর রহমান নিহত হন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি একটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে কাজ করবে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, যিনি দীর্ঘ নির্বাসনের পর আবারও মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন।

১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং ৮০-এর দশকের অধিকাংশ সময় দেশ শাসন করেন। লেখক ও রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, ক্ষমতা দখলের কয়েক মাস আগে এরশাদ বলেছেন, দেশের কার্যক্রম পরিচালনায় সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা উচিত।

এর পর খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের ফলে এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল রুশো বলেন, এরপর থেকে সামরিক বাহিনীর প্রভাব আরও পরোক্ষভাবে দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশ ১৯৯৬ সালের মে মাসে একটি ব্যর্থ শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা দেখেছিল, যখন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম রাষ্ট্রপতির আদেশ অমান্য করেন এবং তার অনুগত সেনারা ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। পরে নাসিমকে গ্রেপ্তার ও পদ থেকে অপসারিত করা হয়।

এক দশক পর, ২০০৭ সালে সামরিক বাহিনী কার্যত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের “পূর্ণ সমর্থন” প্রদান করে। এটি গঠিত হয় ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, যখন রাজনৈতিক সহিংসতা ও নির্বাচনী স্থবিরতার মধ্যে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসে ২০২৪ সালের পরবর্তী ঘটনাগুলোর ফলে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ওই সময়ের অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে “টেকনোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন, কিন্তু সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত” হিসেবে বর্ণনা করেছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছিল এবং সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ রাস্তায় সহিংসতা রোধ করতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল রুশো উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় পুনরায় আসার পর সেনাবাহিনী প্রথমবার বেসামরিক শাসনের অনুগত বা অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

ধোঁয়াশা... 

যদিও সেনাবাহিনী এখনও ক্ষমতা চাওয়ার দাবি করে না, তারা প্রায়শই রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে হাসিনার পতনের কয়েক সপ্তাহ পরে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তিনি যাই ঘটুক না কেন ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন করবেন। সঙ্গে তিনি ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সীমার কথাও উল্লেখ করেন। সমালোচকরা এই সাক্ষাৎকারকে একজন দায়িত্বশীল সেনাপ্রধানের জন্য অভূতপূর্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কারণ এটি সেনাবাহিনীকে দেশের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কাছাকাছি নিয়ে আসে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও লেখক রাজিব হোসেন এই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপকে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “যদি তিনি (ওয়াকার) সব অংশীজন—অন্তর্বর্তী প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তারপর গণমাধ্যমে আসতেন, তা গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু এখানে একতরফাভাবে ঘোষণা করেছেন এবং নিজের ক্ষমতার অবস্থান থেকে সরকারকে অন্ধকারে রেখেছেন। এটি করার কোনো কর্তৃত্ব তার ছিল না।” তিনি আরও বলেন, “আপনি বলতে পারেন এটি একটি ক্রান্তিকাল এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা আছে, কিন্তু তাহলে কি আমাদের সিভিল প্রশাসন থাকার প্রয়োজন নেই?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, জেনারেল ওয়াকার সীমারেখা অতিক্রমের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। তিনি এটিকে ৫ আগস্টের পরবর্তী সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। শাহান বলেন, “সেনা সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়ম, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা অনুসরণ করতে পছন্দ করে। কিন্তু ৫ আগস্ট ছিল একটি রাজনৈতিক বিচ্ছেদ, যা সেনাবাহিনী ও জাতিকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়—বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থায়িত্ব, বৈধতা এবং তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে।”

এই উদ্বেগগুলো সম্ভবত ওয়াকারকে কথা বলতে বাধ্য করেছিল। স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তাত্ত্বিকভাবে যুক্তিসঙ্গত হলেও, ১৮ মাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করার পর এটি তার ভূমিকার বাইরে চলে যায়। শাহান আরও উল্লেখ করেন, এই সময় নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দলের দাবির সঙ্গে মিল দেখা যায়—বিএনপি তখন বারবার নির্বাচনের রোডম্যাপ বা সময়সীমার জন্য চাপ দিচ্ছিল।

আট মাস পর, ২০২৫ সালের মে মাসে স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, একটি সামরিক সমাবেশে জেনারেল ওয়াকার আবারও তার অবস্থান অটল রাখেন। তিনি বলেন, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। এর পর ইউনূসের বিশেষ উপদেষ্টা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ফেসবুকে লিখেন, সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না এবং নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ করা সেনাপ্রধানের এখতিয়ারগত বাইরে ছিল।

ঠিক এই সময় রাজনৈতিক মতভেদ বাড়তে থাকে এবং গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ইউনূস পদত্যাগ করতে চাইছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এত নিবিড় বিতর্কের আরেকটি কারণ হলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ক্ষত ও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।

হাসিনার রেখে যাওয়া ছায়া

হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়শই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০০৯ সাল থেকে হাসিনার শাসনের একটি মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে গুমের ঘটনাকে চিহ্নিত করেছে।

২০২১ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, “এই ঘটনাগুলো বিরোধী দলের সদস্য, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের লক্ষ্য করে করা হয়েছে।”

সমালোচকরা বলছেন, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো শাসনের কেন্দ্রে চলে এসেছিল এবং সেই যন্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাবেক কর্মকর্তা রাজিব হোসেন মনে করেন, হাসিনা আমলের উত্তরাধিকার এখনও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “আপনি যদি নেতৃত্বের দিকে তাকান—জেনারেল, পাঁচজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং কিছু মেজর জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল—পেশাদার গুটিকয়েক কর্মকর্তা ছাড়া অনেকেই হাসিনার ব্যবস্থার অংশ ছিলেন।”

গুম সংক্রান্ত বাংলাদেশের তদন্ত কমিশন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গুমকে রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কমিশন এক হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা যাচাই করেছে।

যাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা গেছে, তাদের মধ্যে প্রায় ৭৫% ছিল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন, এবং প্রায় ২২% বিএনপি। বর্তমান নিখোঁজ বা মৃতদের মধ্যে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সংখ্যা প্রায় ৬৮% এবং জামায়াত ও সহযোগীদের সংখ্যা প্রায় ২২%।

কমিশন আরও জানিয়েছে, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ২০১৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। কমিশন যুক্তি দেয়, ডিজিএফআই আওয়ামী লীগের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

বর্তমানে ১৫ জন চাকুরীরত সেনা কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা সিভিল ট্রাইব্যুনালে গুম, হত্যা এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে বিচারাধীন।

এই বিচার প্রক্রিয়া বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে সিভিল কোর্টে চাকরীরত সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নজির অত্যন্ত বিরল।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া ফেসবুকে লিখেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচার নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে যে মতভেদ প্রকাশিত হয়েছে, তা অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গভীর ফাটল সৃষ্টি করেছে।

তবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা রাজিব হোসেন এই বক্তব্যের সাথে একমত নন। তিনি বলেন, “এই বিচারগুলো সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করছে না। বরং, কতিপয় স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তার অপরাধের কারণে যে কলঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে মুক্ত করার জন্য এটি এক ধরনের প্রায়শ্চিত্ত।”

তিনি যুক্তি দেন, এই জবাবদিহিতা তরুণ কর্মকর্তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং সামরিক বাহিনীকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল রুশোও মনে করেন, হাসিনার আমলে সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে জড়িত হয়েছিল কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নীতি অনুসারে নয়, বরং কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ারের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের কারণে।

রুশো বলেন, “পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং এবং অন্যান্য নিয়োগে নির্বাহী বিভাগ যথেষ্ট প্রভাব রাখত। যখন আপনি পোস্টিংয়ে প্রভাব খাটান, তখন কিছু কর্মকর্তার আনুগত্য প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভুর দিকে চলে যায়। এতে পেশাদারিত্ব ও সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক কিন বলেন, বাংলাদেশে সামরিক বাহিনী একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকবে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের কিছু প্রভাব অব্যাহত থাকবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গত ১৮ মাসের শিক্ষা অনুযায়ী, সরাসরি ক্ষমতায় থাকা থেকে বিরত থাকা এবং বেসামরিক প্রশাসনকে সমর্থন দেওয়াই সেনাবাহিনীর জন্য শ্রেয়। এতে তারা একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র ও বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে।

কিন আরও যোগ করেন, এই দায়িত্ব শুধু জেনারেলদের ওপর নয়। বেসামরিক রাজনীতিকরাও প্রলোভন সামলাতে শিখতে হবে, যাতে তারা সামরিক বাহিনীকে অপব্যবহার করতে না পারে।

সূত্র- আলজাজিরা

ads
ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ