দেশে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের ভয়াবহতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।
সংস্থাটির মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে সারা দেশে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের ২৯টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন। এর আগের মাস ডিসেম্বরেও ২৪টি গণপিটুনির ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছিলেন।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রকাশিত এমএসএফের জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে আসে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সংবাদ এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতি মাসে এই প্রতিবেদন তৈরি করে সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সরকারের সময়ে মব সন্ত্রাসে মানুষ হত্যার ঘটনা বেড়েছে। এমএসএফের ভাষ্য অনুযায়ী, “গণপিটুনির ঘটনায় জানুয়ারিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে।”
সংস্থাটি মনে করে, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা নিঃসন্দেহে একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সংঘটিত ২৯টি গণপিটুনির ঘটনায় আহত ২১ জন পরে মারা যান। গুরুতর আহত হয়েছেন ২৬ জন এবং ১৭ জনকে আহত অবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে একজন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, ১০ জন চুরির অভিযোগে, দুজন খুনের অভিযোগে, একজন ডাকাতির অভিযোগে, একজন পরকীয়ার অভিযোগে, চারজন বাকবিতণ্ডার জেরে, একজন মাদক ব্যবসার অভিযোগে এবং একজন চাঁদাবাজির অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হন।
অন্যদিকে, ডাকাতির অভিযোগে আটজন, চুরির অভিযোগে তিনজন, পরকীয়ার অভিযোগে দুজন, ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে একজন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হওয়ার অভিযোগে তিনজন এবং কটূক্তি, প্রতারণা ও প্রেমসংক্রান্ত অভিযোগে নয়জন গুরুতর আহত হন।
নির্বাচনি সহিংসতা: ৪ জন নিহত, আহত ৫০৯
এমএসএফের প্রতিবেদনে জানুয়ারি মাসের আরেকটি বড় মানবাধিকার সংকট হিসেবে উঠে এসেছে নির্বাচনি সহিংসতার চিত্র। সংস্থাটির তথ্যমতে, জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় চারজন নিহত হন এবং আহত হন ৫০৯ জন।
ডিসেম্বর মাসে যেখানে সাতটি সহিংসতায় একজন নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছিলেন, সেখানে জানুয়ারিতে সহিংসতার মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসের নির্বাচনি সহিংসতা ছিল এ সময়ের অন্যতম “সবচেয়ে ভয়াবহ” মানবাধিকার সংকট। এ ছাড়া মাসজুড়ে ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন ২১৫ জন এবং দুষ্কৃতিকারীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন। আগের মাসে ১৬টি রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হন ১২৪ জন, নিহত হন চারজন।
এমএসএফের তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, “এটি প্রমাণ করে যে জানুয়ারি মাসে নির্বাচনি প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে।”
সংস্থাটির সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩টি ঘটনা ঘটেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে। এ ছাড়া বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৩টি, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে নয়টি, গণঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে একটি এবং বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
রাজনৈতিক সহিংসতার ২৪টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১৬টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দুটি এবং বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে পাঁচটি সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় নিহত ছয়জনই বিএনপির কর্মী ও সমর্থক।
এ ছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার বাইরে অপমৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ১০ জন। তাদের মধ্যে চারজন বিএনপির, দুজন জামায়াতের, দুজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের, একজন কিশোর এবং একজন বৃদ্ধা রাজনৈতিক রোষানলে পুড়ে মারা গেছেন।
কারা হেফাজতে মৃত্যু বেড়ে ১৫
কারাগারে বন্দিদের মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে জানুয়ারিতে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে কারা হেফাজতে মোট ১৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যেখানে ডিসেম্বর মাসে এই সংখ্যা ছিল নয়।
নিহতদের মধ্যে চারজন ছিলেন কয়েদি এবং ১১ জন হাজতি। মৃত হাজতিদের মধ্যে পাঁচজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানুয়ারিতে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুইজন, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন এবং জামালপুর জেলা কারাগারে একজন কয়েদির মৃত্যু হয়। হাজতিদের মধ্যে কেরাণীগঞ্জ, নরসিংদী, লক্ষ্মীপুর, নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, পটুয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মেহেরপুর, নওগাঁ জেলা কারাগার এবং রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন করে বন্দির মৃত্যু হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই বন্দিরা কারাগারের বাইরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এদিকে, মেহেরপুর জেলা কারাগারে নয়ন নামে এক কয়েদিকে চোখ বেঁধে দফায় দফায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্বরত কারারক্ষী মিশু, হযরত ও হাবিবের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেছেন সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একাধিক বন্দি।
এমএসএফ জানিয়েছে, কারাগারে বন্দিদের শারীরিক নির্যাতনের কোনো আইনি বৈধতা নেই। অথচ নয়নের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে—এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর বলে মনে করছে সংস্থাটি।







