আফগানিস্তান এবং পাকিস্থান দুটিই সুন্নিপ্রধান মুসলিম দেশ, এমনকি
সাংবিধানিকভাবেই দেশ দুটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবেই স্বীকৃত। ইতিহাসের দীর্ঘ
পরিক্রমায় দেশ দুটি বহুবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে সপ্তাহব্যাপী
চলা পাক-আফগান যুদ্ধ বন্ধ হয় তুরস্কের মধ্যস্থতায়। আবারও গতকাল ২৬
ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ
শহরে অভিযান চালায় পাকিস্তান। এমনকি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেছে, তারা একটা সর্বাত্মক যুদ্ধে
জড়িয়েছে।
গতকাল ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পরিচালিত ‘অপারেশন
গজব লিল–হক’ অভিযানে ১৩৩ জন তালেবান সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি
করেছে দেশটির সরকার। পালটা প্রতিক্রিয়ায় তালেবান সরকারও ড্রোন হামলাসহ
সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ঘাটিতে হামলা চালিয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হচ্ছে, ২০২১ সাল থেকে আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে ৭৫টি সংঘর্ষ
হয়েছে। অন্য কোনো প্রতিবেশি দেশের পরস্পরের বিরুদ্ধে এত বেশি সংঘর্ষে
জড়ানোর ইতিহাস নেই।
আসলে দুটি সুন্নিপ্রধান মুসলিম দেশ কেন বারবার
সংঘাতে জড়িয়ে যাচ্ছে? এর পেছনের কারণ কী? বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর খেলার ঘুটিতে
পরিণত হয়েছে দুই দেশ নাকি রয়েছে আরও অন্য কোনো গভীর কারণ?
দ্য ভয়েস২৪-এর পাঠকদের জন্য এই যুদ্ধের নেপথ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তুলে ধরা হলো-
১. TTP ও জঙ্গি তৎপরতা
দ্বিপক্ষীয়
উত্তেজনার অন্যতম বড় কারণ হলো Tehrik-i-Taliban Pakistan (টিটিপি)।
পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে এই সংগঠনের সদস্যরা
পাকিস্তানে হামলা চালায়।
বিশেষ করে আফগানিস্তানে Taliban ক্ষমতায়
ফেরার পর টিটিপির তৎপরতা বেড়েছে বলে ইসলামাবাদ দাবি করে। সীমান্তবর্তী
খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে হামলার ঘটনায় পাকিস্তান সরাসরি আফগান
ভূখণ্ডকে দায়ী করে আসছে।
অন্যদিকে আফগান তালেবান সরকার বলে, তারা
কোনো দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয় না। তবে বাস্তবে এই
ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
২. সীমান্ত ফেন্সিং ও ডুরান্ড লাইন বিরোধ
দুই
দেশের মধ্যে প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন সীমান্ত দীর্ঘদিন
ধরেই বিতর্কিত। পাকিস্তান এই সীমান্তকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মনে করলেও
আফগানিস্তানের বহু রাজনৈতিক শক্তি ঐতিহাসিকভাবে এটি মেনে নেয়নি।
সীমান্তে
অনুপ্রবেশ ও জঙ্গি তৎপরতা ঠেকাতে পাকিস্তান কাঁটাতারের বেড়া (ফেন্সিং)
নির্মাণ শুরু করে। আফগান পক্ষের দাবি, এটি একতরফা সিদ্ধান্ত। ফলে সীমান্তের
বিভিন্ন পয়েন্টে মাঝে মধ্যেই গুলি বিনিময় ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
৩. আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতি
পাকিস্তান–আফগানিস্তান
সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতি।
যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ত্যাগের পর মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব
বিস্তার নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
চীন, রাশিয়া, ইরান ও
ভারত—সবাই আফগান ইস্যুতে নিজস্ব কৌশল নিয়ে সক্রিয়। পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে
আফগানিস্তানে প্রভাব রাখতে চায়, যাতে তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ
সুরক্ষিত থাকে। এই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার লড়াইও উত্তেজনা বাড়ায়।
৪. শরণার্থী সংকট
দশকজুড়ে
সংঘাতের কারণে লাখো আফগান নাগরিক পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে
সঙ্গে শরণার্থী ইস্যু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিতর্কে রূপ নিয়েছে।
পাকিস্তান
মাঝে মাঝে অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত করে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, যা
কাবুলের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। একইসঙ্গে পাকিস্তানের ভেতরে জঙ্গি
তৎপরতার সঙ্গে কিছু শরণার্থীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে
তোলে।
৫. পশতুন জাতিগোষ্ঠির বিভাজন সংকট
ডুরান্ড
লাইনের কারণে পশতুন জাতিগোষ্ঠি দুই দেশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সীমান্তের দুই
পাশেই বিপুলসংখ্যক পশতুন জনগোষ্ঠি বসবাস করে, যাদের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও
পারিবারিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।
এই বিভাজন রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী আবেগকে
উসকে দেয়। আফগানিস্তানের কিছু মহল ঐতিহাসিকভাবে ‘পশতুনিস্তান’ ইস্যু
উত্থাপন করেছে, যা পাকিস্তানের জন্য সংবেদনশীল নিরাপত্তা প্রশ্ন। ফলে
সীমান্ত প্রশ্নটি শুধু ভূখণ্ডগত নয়, জাতিগত ও পরিচয়ভিত্তিক সংকটেও রূপ
নিয়েছে।
টিটিপি তৎপরতা, ডুরান্ড লাইন ও সীমান্ত ফেন্সিং, পশতুন
বিভাজন, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং শরণার্থী সংকট—এই পাঁচটি ইস্যুই
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ককে অস্থির করে রেখেছে।
তাৎক্ষণিক
সংঘর্ষের পেছনে যতই নির্দিষ্ট ঘটনা থাকুক, মূল সংকটগুলো ঐতিহাসিক ও
কাঠামোগত। টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, সীমান্ত
ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক সংলাপ।







