বিদেশে গিয়ে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন তিনি। পকেটে ছিল ভিসা, বিমানের টিকিট আর কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয় নথিপত্র। তবে বিদেশযাত্রার ঠিক আগমুহূর্তে তল্লাশির সময় বেরিয়ে আসে রূঢ় বাস্তবতা—হাতে থাকা সব কাগজপত্রই ভুয়া। মুহূর্তের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। চরম হতাশায় বিমানবন্দরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই যুবক।
রোববার দিবাগত মধ্যরাতে রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। প্রতারণার শিকার ওই ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ বাবুল হোসেন ওরফে জামাল (৩৫), যিনি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়া বাধা গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় দর্জি জামাল গ্রামের একটি ছোট দোকান চালিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। একটু ভালো থাকার আশায় ২০২০ সাল থেকে তিল তিল করে টাকা জমিয়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। তবে এটিই তার জীবনের প্রথম প্রতারণা নয়; এর আগেও কয়েক দফায় তিনি দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে আড়াই লাখ টাকা দিয়েও বিদেশ যেতে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর সৌদি আরব যাওয়ার চেষ্টায় আরও ৫০ হাজার টাকা খুইয়েছেন। ২০২৪ সালে বেলারুশ যাওয়ার জন্য একটি এজেন্সির সাথে সাড়ে সাত লাখ টাকার চুক্তি করে ধাপে ধাপে তিন লাখ টাকা দেন, কিন্তু সেখানেও সফল হননি। বারবার হোঁচট খাওয়ার পর সম্প্রতি ইউটিউবের একটি চ্যানেলের মাধ্যমে মাদারীপুরের সোহেল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ওই সোহেল তাকে থাইল্যান্ডের 'বিডি ফুড' নামের একটি প্রতিষ্ঠানে মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখান।
জামাল জানান, থাইল্যান্ডে অবস্থানরত আফ্রিদি নামের এক ব্যবসায়ীর কাছে বিকাশ, নগদ ও হুন্ডির মাধ্যমে মোট ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। বিনিময়ে তাকে ভিসা ও টিকিট পাঠানো হয়। রোববার রাত ২টায় ফ্লাইট ধরতে বিমানবন্দরে এসে তিনি জানতে পারেন, তার পাসপোর্ট ছাড়া বাকি সব কাগজই জাল। ঋণের টাকা জোগাড় করতে তিনি দোকানের মালামাল বিক্রি ও চড়া সুদে ধার করেছিলেন। এখন পাওনাদারদের ভয়ে বাড়ি ফেরার সাহস পাচ্ছেন না তিনি।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত সোহেল বর্তমানে কুয়ালালামপুরে নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এমন প্রতারণা প্রায়ই ঘটছে। গত বছরও একইভাবে ১১ জন ব্যক্তি ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে এসে প্রতারিত হয়েছিলেন, যার ধাক্কা সইতে না পেরে এক অভিভাবক জ্ঞান হারিয়েছিলেন। বিদেশের মোহে পড়ে সর্বস্ব হারানো জামালের এখন একমাত্র চিন্তা—কীভাবে তিনি এই ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাবেন।