ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর কঠোর বার্তা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-কে তিনি দুটি পথের একটি বেছে নিতে বলেন—অস্ত্র সমর্পণ অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। তবে এই হুমকির পরও ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া এসেছে, যা নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আইআরজিসি, সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের সব সদস্যের আজ রাতে আমি বলছি, অস্ত্র নামিয়ে রাখো। পূর্ণাঙ্গ দায়মুক্তি দেওয়া হবে।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘অন্যথায় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে।’
কিন্তু এই বার্তার পরও ইরান ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশে হামলা চালায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা রয়েছে।
এরপর রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, তেহরানে এক হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসির ভেতরে বিভাজন তৈরি করা বা তাদের আত্মসমর্পণে উৎসাহিত করাই যদি ট্রাম্পের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তা কার্যকর হয়নি। বরং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—কেন এই বার্তা বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলল না।
আইআরজিসি কী ?
আইআরজিসি ইরানের একটি বিশেষায়িত ও প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী এটি রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোর অংশ হলেও সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীন পরিচালিত হয়।
‘ভেলায়াত-ই ফকিহ’ মতাদর্শে পরিচালিত এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য ইসলামি বিপ্লব রক্ষা এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা। এতে স্থল, নৌ ও বিমান ইউনিট রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ এবং বিদেশি বিশেষ অভিযানের জন্য কুদস ফোর্স।
বর্তমানে আইআরজিসির প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছে। রিজার্ভসহ মোট সদস্যসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ।
অর্থনৈতিক প্রভাব
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তার দায়িত্বও আইআরজিসির ওপর। আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ে তারা কাজ করে, যা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত।
এ ছাড়া অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ ও খনিজসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে আইআরজিসি-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। ইরান এটিকে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ হিসেবে উল্লেখ করে, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র আইআরজিসিকে বিদেশি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই পদক্ষেপ নেয়। জবাবে তেহরান ইইউভুক্ত দেশগুলোর সামরিক বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে।
বাসিজ: অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের শক্তি
আইআরজিসির অধীন পরিচালিত বাসিজ একটি স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী, যার সদস্যসংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট এবং ২০২২–২৩ সালের নারী আন্দোলন দমনে তাদের মোতায়েন করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের বার্তা কেন অকার্যকর
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানে অবশ্যই একজন সর্বোচ্চ নেতা আছেন। সেই সঙ্গে দেশটির ধর্মীয়, সামরিক, আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে একাধিক শক্তির কেন্দ্র আছে। তাঁরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের নির্দেশে সাড়া দেবে বলে মনে হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে তাঁরা বলছেন, এই সংঘাত আরও বাড়ানো হবে। পুরো অঞ্চলে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাবস্থা’ তৈরি করা হবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, এ অঞ্চলের উপসাগরীয় দেশগুলোকেও ব্যাপক ভোগাবে।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, সাম্প্রতিক হামলা এবং খামেনির মৃত্যুর ঘটনা আইআরজিসির প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জোনাথন প্যানিকঅফ বলেন, ‘ইরানের এখনকার শাসনকাঠামোর পরিবর্তনের ফলে দেশটি যে গণতন্ত্রের পথে যাবে—এমনটা না–ও হতে পারে। বরং সম্ভাব্য যেটা ঘটতে পারে, তা হলো আইআরজিসির ক্ষমতায়ন। রাষ্ট্রের ওপর জোরালো সামরিক নিয়ন্ত্রণ।’
অভ্যন্তরীণ চাপ ও নেতৃত্ব প্রস্তুতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রশাসনিক সমস্যার কারণে ইরানে জনঅসন্তোষ বেড়েছে। গত জানুয়ারিতে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভও হয়েছে।
তবে আইআরজিসির কাঠামোগত শক্তি এখনও অটুট। ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে নিহত শীর্ষ নেতাদের জায়গা দ্রুত পূরণ করা হয়েছিল। সম্ভাব্য নেতৃত্বের বিকল্প তালিকাও আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে সংকটের সময়
নেতৃত্বে শূন্যতা না তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মত, ট্রাম্পের দায়মুক্তির প্রস্তাব আইআরজিসির ওপর কোনো বাস্তব প্রভাব ফেলেনি। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে বাহিনীটি আরও সংগঠিত এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।