দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, তবু লাইনের শেষ দেখা নেই। রাজধানীর কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাক যেন হয়ে উঠেছে বহু মানুষের শেষ ভরসা।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা ১২ মিনিটে ঢাকার কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচে রাস্তার পাশে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর একটি ট্রাক ঘিরে ছিল দীর্ঘ সারি। সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে সীমিত ও নিম্ন আয়ের অসংখ্য মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছিলেন—তাদের বড় অংশই নারী।
৫৫০ টাকায় নিত্যপণ্য, বাজারে লাগছে ৯৫০
টিসিবির ট্রাক সেল কর্মসূচির আওতায় একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ১১৫ টাকা লিটার দরে দুই লিটার সয়াবিন তেল, ৭০ টাকা কেজি দরে দুই কেজি মসুর ডাল, ৮০ টাকায় এক কেজি চিনি, ৬০ টাকায় এক কেজি ছোলা এবং ৮০ টাকায় আধা কেজি খেজুর কিনতে পারেন। সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ৫৫০ টাকা।
খোলা বাজারে একই পণ্য কিনতে প্রায় ৯৫০ টাকা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ প্রায় ৪০০ টাকার ব্যবধান—যা অনেক পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করা আর না পারার পার্থক্য গড়ে দেয়।
আহত নাসিরের লড়াই
লাইনের পাশে রিকশায় বসে ছিলেন ৪০ বছর বয়সী নাসির খান। রিকশার গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা ক্রাচ, বাম পা প্লাস্টারে মোড়ানো। আগে তিনি বর্জ্যবাহী রিকশাভ্যান চালাতেন। চার মাস আগে দুর্ঘটনায় ভ্যান উল্টে তার পা থেঁতলে যায়। এরপর থেকেই কর্মহীন।
স্ত্রী মাহিনুর বেগম তিনটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। মাসিক আয় ৯ হাজার টাকা। এই আয়েই স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
নাসির বলেন, ‘স্কুলে পড়া দুই মেয়েকে নিয়ে আমাদের এভাবে বেঁচে থাকা সত্যিই অসম্ভব। আমি যদি এই টিসিবি প্যাকেজ পাই, তবে এটি কিছুটা উপকারে আসবে।’
মাহিনুর বারবার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনুরোধ করছিলেন, যেন অসুস্থ স্বামীকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতে না হয়। নাসিরের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় প্রায় আধঘণ্টা পর ট্রাক থেকে তাদের হাতে প্যাকেজ তুলে দেওয়া হয়।
চার ঘণ্টা অপেক্ষা, তবু স্বস্তি
মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ডাব বিক্রেতা মো. শাকিল সকাল ১১টায় লাইনে দাঁড়ান। প্রায় আড়াইটার দিকে তিনি পণ্য হাতে পান।
তিনি বলেন, ‘এই প্যাকেজের জন্য আমাকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই সময়ে আমার ডাবের দোকান বন্ধ ছিল। ফলে আমার লোকসান হয়েছে। তবুও, আমি ভাগ্যবান, শেষ পর্যন্ত প্যাকেজটি পেয়েছি।’
বাড়ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি
খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।
সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ, অক্টোবরে তা কমে ৭ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে এলেও পরবর্তী তিন মাসে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে
বিশ্বব্যাংক-এর ২০২৫ সালের পূর্বাভাস বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
দৈনিক ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম আয়ে বসবাসকারী চরম দরিদ্র মানুষের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে উঠতে পারে, যা অতিরিক্ত ৩০ লাখ মানুষকে চরম দুর্দশায় ফেলবে। তবে ২০২৬ সালে কিছুটা উন্নতির আভাসও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) গত বছরের আগস্টে জানায়, বর্তমানে প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন, যেখানে ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। চরম দারিদ্র্যের হার তিন বছর আগের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে এ বছর ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে একজন চরম দরিদ্র এবং প্রতি চারজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে। আরও ১৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রমজান ঘিরে টিসিবির কার্যক্রম
রমজানে স্বস্তি দিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে টিসিবি দেশব্যাপী ট্রাক সেল শুরু করেছে, যা শুক্রবার ও সরকারি ছুটি বাদে আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত চলবে।
রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০টি নির্ধারিত স্থানে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সারাদেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাক প্রতিদিন ভর্তুকিমূল্যে পণ্য সরবরাহ করছে, প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ পরিবারের জন্য বরাদ্দ থাকে।
২০ দিনের এই কর্মসূচিতে আনুমানিক ৩৫ লাখ ভোক্তার মধ্যে ২৩ হাজার টন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৬৪ লাখ টন খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে, যা পরে বেড়ে ১৯ দশমিক ৯৩ লাখ টনে পৌঁছেছে। তবুও ট্রাকের সামনে মানুষের সারি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
এ বিষয়ে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।
টিসিবিই ভরসা
৭০ বছর বয়সী মুলকুচ বিবির কাছে টিসিবির ট্রাক মানে টিকে থাকার লড়াই। বুধবার রাতে ঘুমানোর আগে বাজারের ব্যাগ আর পানির বোতল প্রস্তুত করে রাখেন। ঘরে তেল, চিনি, ছোলা কিছুই ছিল না।
তিনি বলেন, ‘আগামীকাল যদি টিসিবি ট্রাক থেকে মাল কিনতে না পারি, তবে অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আর কেনা হবে না।’
সেহরি শেষে অল্প বিশ্রাম নিয়ে পানি সংগ্রহ করে সকাল ৮টার কিছু পর কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনে পৌঁছান। তখন তার সামনে ৩৩ জন দাঁড়িয়ে। বয়সের কারণে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে একসময় সিঁড়িতে বসে বিশ্রাম নেন। সকাল ১০টার দিকে ট্রাক এলে দুপুরে পণ্য কিনতে সক্ষম হন।
তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী ২৭ বছর আগে মারা গেছেন। তারপর থেকে আমি মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গেই থাকি। ওরা দুজনেই গার্মেন্টস শ্রমিক এবং ওদের দুজনের আয়ে কোনোমতে সংসার চলে।’
আরও বলেন, ‘এখান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনে যে টাকা বাঁচে, তা দিয়ে আমরা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারি। তা না হলে চলা খুবই কঠিন হয়ে যেত।’
শিশুকে কোলে নিয়েই লাইনে
আগারগাঁওয়ের মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা মিনুয়ারা বেগম সকাল ৯টায় শেরেবাংলা নগরের টিসিবি ট্রাকের সামনে পৌঁছান। এক বছরের সন্তানকে দেখার কেউ না থাকায় তাকেই সঙ্গে আনেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই শিশুকে দুধ খাওয়াতে দেখা যায় তাকে।
তিনি বলেন, ‘বাসায় আমার বাচ্চাকে দেখার কেউ নেই, আর স্বামীর একার আয়ে সংসার চালানো খুব কঠিন। তাই টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে এসেছি এবং বাধ্য হয়ে সঙ্গে বাচ্চাকেও নিয়ে এসেছি।’
দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে ট্রাক এলে প্রায় আড়াইটায় তিনি কেনাকাটা শেষ করেন।
পরিধি বাড়ানোর আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, টানা তিন বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্নআয়ের মানুষের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষের চাহিদার তুলনায় টিসিবির বর্তমান কার্যক্রমের পরিধি পর্যাপ্ত নয়। আমরা আশা করি, নতুন সরকার এই কার্যক্রমের আওতা আরও বাড়াবে এবং আরও বেশিসংখ্যক অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর উপায় খুঁজে বের করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক শ্রমজীবী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যার ফলে অনেক সময় তাদের অর্ধেক দিনের আয় নষ্ট হয়। এটি তাদের জন্য বাড়তি আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা সহজেই এসব পণ্য পেতে পারেন।’
‘এমনকি রিকশাচালক, ছোট দোকানের কর্মচারী এবং অন্যান্য শ্রমঘন পেশায় নিয়োজিত অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরও এলাকাভিত্তিক কর্মসূচির আওতায় আনা উচিত। যেসব এলাকায় নিম্নআয়ের মানুষের বসবাস বেশি, সেখানে বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হলে তাদের কষ্ট কিছুটা কমবে এবং এই কঠিন সময়ে তারা স্বস্তি পাবেন।’
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের মন্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।