ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ১২ মার্চ। উদ্বোধনী দিনেই সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যেখানে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অতীত শাসনামলের নানা বিষয় গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলন এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিবরণও ভাষণে অন্তর্ভুক্ত থাকছে।
এছাড়া বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোকেও ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং প্রতি বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেন। এ ভাষণের ওপর সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয় এবং সদস্যরা তা নিয়ে আলোচনা করেন। অধিবেশনের শেষ দিনে ওই প্রস্তাব গৃহীত হয়। যদিও ভাষণ রাষ্ট্রপতি পাঠ করেন, এর খসড়া প্রস্তুত করে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, যেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের তথ্য সংযোজন করা হয়। পরে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভাষণের খসড়া ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং বর্তমানে যাচাই-বাছাই চলছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের রিপোর্ট শাখার এক কর্মকর্তা জানান, সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের অধীনে প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রপতি অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং খসড়া প্রস্তুত রয়েছে। অনুমোদনের জন্য এটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
নতুন সংসদের ভাষণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আরও আগে। প্রায় তিন মাস আগে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভাষণ চূড়ান্ত করার কাজ জোরদার করা হয়। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির জন্য ১৪৩ পৃষ্ঠার ভাষণ প্রস্তুত করা হয়েছিল। এবারও ভাষণের আকার প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠার হতে পারে এবং এর বড় অংশে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে পুরো ভাষণ রাষ্ট্রপতি সংসদে পড়ে শোনাবেন না। গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপস্থাপন করা হবে এবং বাকি অংশ স্পিকারের অনুমতিক্রমে পঠিত হিসেবে গণ্য হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সূত্র আরও জানিয়েছে, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন, গুম, খুন ও তথাকথিত ‘আয়নাঘর’-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়গুলোও ভাষণে স্থান পাচ্ছে।
এছাড়া ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও দেশত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ও ভাষণে অন্তর্ভুক্ত থাকছে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিসংখ্যানও এতে সংযোজন করা হয়েছে।
১২ মার্চের অধিবেশন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১২ মার্চ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে—এটুকুই তিনি জানেন; এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।
অন্যদিকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে তিনি জেলা ও দায়রা জজ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া তার ভাষণে সে সময়ের নির্বাচনের প্রশংসা এবং শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রশংসা স্থান পেয়েছিল।