২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:২০ এ.এম

প্রশাসনে বড়সড় রদবদল, সামনে আরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত

প্রশাসনে বড়সড় রদবদল, সামনে আরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রাষ্ট্রের শীর্ষ প্রশাসনে শুরু হয়েছে দ্রুত ও তাৎপর্যপূর্ণ পুনর্বিন্যাস। জনপ্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা খাত—তিন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনেই উচ্চপর্যায়ে একের পর এক বদল ঘটছে, যা প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। কয়েকজন সচিবকে সংযুক্ত করা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। ফলে প্রশাসনে ব্যাপক পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, এটি কেবল প্রথম ধাপ; সামনে আরও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সচিব পদে শূন্যতা, মাঠ প্রশাসনেও পরিবর্তনের আভাস

সচিবালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, চুক্তি বাতিল ও সংযুক্তির কারণে বর্তমানে অন্তত ১২টি সচিব ও সমপর্যায়ের পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) পর্যায়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও ধাপে ধাপে পরিবর্তন আসতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদারকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে। অপরদিকে শ্রমসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়াকে পিএসসির সচিব হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টিও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনের ভেতরে নিয়োগ ও পদায়নকে ঘিরে নানা আলোচনা চলছে। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর কিছু রদবদল স্বাভাবিক। তবে নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি, যাতে কেউ অহেতুক ক্ষতিগ্রস্ত না হন। পদায়ন ও বদলি ঘিরে তদবিরও বেড়েছে বলে জানা গেছে।

অনেক কর্মকর্তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন অনেকে।

জনপ্রশাসনে প্রথম ধাপের পদক্ষেপ

সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই জনপ্রশাসনে দৃশ্যমান রদবদল শুরু হয়। গত সোমবার পৃথক প্রজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিনকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

একই সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তির অবশিষ্ট সময় বাতিল করা হয়। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক তিন অতিরিক্ত সচিবকে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়ে পদোন্নতির মাধ্যমে এসব পদে বসিয়েছিল।

নতুন সরকার গঠনের পর অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আগে বিএনপি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ছিলেন।

পুলিশের নেতৃত্বে নতুন মুখ

প্রশাসনিক পরিবর্তনের ধারায় পুলিশ বাহিনীতেও এসেছে রদবদল। গতকাল আলী হোসেন ফকিরকে পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) ছিলেন; সেখান থেকে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে আইজিপি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পুলিশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের পদ নিয়েও আলোচনা চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও বাহিনীর প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার—এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখেই পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের নেতৃত্বে রদবদল অস্বাভাবিক নয়; তবে পেশাদারত্ব বজায় রাখা এবং বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক করা হয়েছে মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে। তিনি এত দিন এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটে কর কমিশনারের চলতি দায়িত্বে ছিলেন।

শিক্ষা প্রশাসনেও বদলের হাওয়া

উচ্চশিক্ষা অঙ্গনেও পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান অব্যাহতির আবেদন জমা দিয়েছেন। নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিএনপিপন্থী কয়েকজন শিক্ষকের মধ্যে পদ পাওয়ার তৎপরতা বেড়েছে বলেও জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে কয়েকটি পদে পরিবর্তন আসতে পারে।

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে গত বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে মহাপরিচালকের পদ শূন্য রয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেও চেয়ারম্যান নেই। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে দ্রুত নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষকদের মতে, স্থিতিশীল নেতৃত্ব ছাড়া শিক্ষা খাতে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়; তাই নিয়োগে পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।

অতীত অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রত্যাশা

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরবর্তী ছয় মাসে প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল হয়—জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের ১ জন এবং অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদে ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন এবং অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ জনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। পরে আরও কয়েকজনকে ওএসডি করা হয়েছিল।

তৎকালীন সময়ে সচিবসহ বেশ কিছু পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এখনো কয়েকজন সচিব চুক্তিতে আছেন। ডিসি নিয়োগসহ বিভিন্ন পদায়নে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠে; এমনকি হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে। প্রশাসনের ভেতরে কেউ কেউ অভিযোগ করেন, কিছু সিদ্ধান্ত যথাযথ যাচাই ছাড়া নেওয়ায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বড় সুপারিশ বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘দলীয়করণ নয়’—বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, নতুন সরকারের পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় দলীয়করণের অভিযোগ যেন না ওঠে। ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়তে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ–বদলি–পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি এবং কেউ যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা হবে।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, “অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার প্রবণতা থাকে। এটা হতেই পারে। কিন্তু গুছিয়ে নেওয়ার সময় দেখা হয় ‘আমাদের সঙ্গে ছিল কি না’। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা ভুক্তভোগী হয়ে যান। এবার নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, আগের মতো যেন না হয়। নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতা দেখেই যেন পরিবর্তনগুলো হয় এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ যেন বঞ্চিত না হন।”