২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৬ এ.এম

ইনসাফ-আজাদী আর ইনকিলাব, থাক না বিবাদহীন, বাধাহীন: আসিফ বিন আনোয়ারের ফেইসবুক পোস্ট থেকে

ইনসাফ-আজাদী আর ইনকিলাব, থাক না বিবাদহীন, বাধাহীন: আসিফ বিন আনোয়ারের ফেইসবুক পোস্ট থেকে

বাঙলা ভাষা থেকে আরবি ফারসি শব্দগুলো ছেঁটে ফেললে, ভাষার ভান্ডারে ভাটা পড়বে। আমদানি করা রসদ, কবে যে পাচকের কাছে অপরিহার্য সরঞ্জাম হয়ে উঠেছে, তা টের পাবেন শুধু তা বাছতে বসলে। স্বাদ-গন্ধ-বর্ণহীন রান্নায় খাঁটিত্বের পরাকাষ্ঠা টিকে থাকবে আপনার ফাঁপা দেমাগের বায়বীয় স্ফীতি হয়ে। রসনা অতৃপ্ত রবে; বেদনা অব্যক্ত।

কেবল তৎসম শব্দের ঘরঘরে আওয়াজে, ভাষার পেলবতা ঘুঁচে গিয়ে পড়ে থাকবে সরীসৃপের খসখসে খোলস। সে প্রাণী না পারবে ছুটতে, না পারবে ভাসতে। কবিতা শোনাবে ভাষণের মত। গল্প শোনাবে খবরের মত। আপনার শুদ্ধতাবাদী প্রকল্প ভাষার উৎকর্ষতা বৃদ্ধির আয়োজনকে ভেস্তে দেবে। দিস্তা-দিস্তা বাঙলা সাহিত্য হয়ে উঠবে দস্তাবেজ। কবিরা দলিল লিখতে বসবে। উপন্যাসিকেরা লিখবে সংবিধান। 

নজরুল রক্তে’র বদলে খুন লিখেছিলেন বলে সেকালের শুদ্ধতাবাদীরা গোস্বা করেছিলেন। এমনকী রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত মৃদু আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু নজরুল কি দমবার পাত্র? স্বাহা সীমন্তে রক্তটীকা এঁকে যখন দিগম্বরী দেবীকে তিনি জাগিয়ে তুলেছেন, তখনি কোন লাবণ্যময়ীর আঁটো খোঁপা তাঁর হৃদয় গ্রেফতার করেছে। “আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন, দিল মেরা ওহি ফঁস গেয়ি”। সেভাবে দেখতে গেলে সংস্কৃতও তো আসলে বিদেশী ভাষাই। ভারতীয় আর্যরা ভারতবর্ষব্যাপী যে আর্যসভ্যতা গড়ে তুলেছিল, মহাভারতে যাকে আর্যাবর্ত বলা হয়েছে, বাঙলা ছিল তার বাইরে। তাই বাঙলা ভাষায় আর্যদের কোন তালুকদারি নেই। 

আসল কথাটা হল ভাষায় বিদেশী শব্দের এই গ্রহণ-বর্জনের বেলায় আপনার হৃদয় উদার কিনা, হস্ত প্রসারিত কিনা। আপনার মনে যদি ভাষাকে কোন একটি ধর্মীয় বা গোষ্ঠীয় সম্প্রদায়ের জন্য আলাদাভাবে বিশিষ্ট করার ইচ্ছা থাকে তাহলে আপনার হৃদয় অনুদার। সংকীর্ণতার অভিসন্ধি নিয়ে শুধু শব্দের আমদানি করে ভাষার উৎকর্ষ সাধন হয় না। সেই আমদানিও অপচয়ের খাতায় থেকে যায়। এহেন অপ-তৎপরতা পাকিস্তানী আমলে খুব সিদ্ধি পায় নি। তাদের লক্ষ্য ছিল বাঙলা ভাষার খৎনা করিয়ে তাকে মুসলমানি বাঙলায় রূপ দেয়া। ইসলামী তহজীব ও তমুদ্দূন কসমেটিক সার্জারির মাধ্যমে বাঙলায় প্রতিস্থাপিত করা। তার ফল হয়েছিল অনেকটা এই রকম। একটা বেতার অনুষ্ঠানে ঢাকার পাকিস্তান রেডিওতে বক্তারা বলছিলেন – “গোজাশতা এশায়াতে আমরা অতীতে বাঙলা ভাষার নানা মোড় পরিবর্তনের কথা মোখতাসারভাবে উল্লেখ করেছি। আসলে বাঙলা ভাষা মুসলমান আমীর-ওমরাহদের নেক নজরেই পরওয়ারেশ পেয়েছিল, ও শাহী দরবারের শান শওকত হাসিল করেছিল”। 

তাই আমি বলি কি থাক না এ সমস্ত কথা। ইনসাফ, আজাদী আর ইনকিলাব। থাক না বিবাদহীন, বাধাহীন। কালের পরীক্ষায় এরা যদি টিকে যায়, তাহলে বাঙলা সমৃদ্ধতর হল, আর না টিকলে আমদানিকারকের অনুদার অভিসন্ধী প্রমাণিত হল। লাভ তো দু’দিকেই।