২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৭ পি.এম

নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর জন্য আবেদন করেছে

নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর জন্য আবেদন করেছে

নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই বাংলাদেশ সরকার স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-এর চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে। 

গত বুধবার সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-এর চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠান। এতে দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময়কাল ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণ করবে বলে নির্ধারিত ছিল। বর্তমানে উত্তরণের চূড়ান্ত তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়াও চলমান।

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার দেশটি নেপাল ও লাওসের মতো একই সময়ে উত্তরণে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য:

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন দায়িত্বে আসার পর বুধবার সাংবাদিকদের বলেন মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদী, “এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করতে যা যা প্রয়োজন, সবই করা হবে। আজ থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। ইআরডির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে উত্তরণ বিলম্বিত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।” একই দিনই ইআরডি সচিব সিডিপি চেয়ারম্যানকে চিঠি প্রদান করেন।

চিঠিতে সরকারের যুক্তি:

চিঠিতে বলা হয়েছে, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস)’ অনুযায়ী অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের পাঁচ বছরের প্রস্তুতি প্রক্রিয়া একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।

চিঠিতে বৈশ্বিক সংকটের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা। দেশি সংকট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন অসম্পন্ন থাকা।

সরকারের মতে, এসব অভিঘাতের কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ হ্রাস, কর-জিডিপি অনুপাত কম, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কম এবং নতৃন সৃষ্টির হ্রাস হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্রড ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে দারিদ্র্য হ্রাসের কার্যক্রমও প্রভাবিত হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার সময় ও মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছে। এর ফলে উত্তরণ-সংক্রান্ত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

এছাড়া, এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়েও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইইউ-র জিএসপি প্লাস সুবিধা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির পরিবর্তন, প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য রপ্তানি নিম্নমুখী এবং বাংলাদেশ অতিমাত্রায় তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল।

চিঠিতে সরকারের আরও দাবি, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো উন্নয়ন এগিয়েছে, কিন্তু একাধিক সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছে।

সরকার জাতিসংঘের এলডিসি নিরীক্ষণ সংস্থা (ইউএনওএইচআরএলএলএস)-এর ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে অনুরোধ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ধারাবাহিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রস্তুতি সময়কাল গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে উত্তরণ জাতিসংঘের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান:

বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসি থাকার কারণে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুবিধা পায়। তিন বছর অন্তর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন হয়—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতার সূচকে নির্ধারিত মান পূরণ করতে হয়।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে—মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই), এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়েছে।

বিশেষজ্ঞের মত:

সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “উত্তরণের মানদণ্ড অনুযায়ী এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সুযোগ নেই। তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। জাতীয় সংবাদ নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে উত্তরণ টেকসই করতে আরও সময় দরকার।”

তিনি আরও বলেন, “নতুন সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে এলডিসি পেছানোর আবেদন করে ভালো করেছে। সিডিপি এটি মূল্যায়ন করবে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। ভারত, চীন ও ইইউ-এর মতো বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেই এখনই সরকারের কাজ শুরু করতে হবে।”