টানা ৯ মাসের আলোচনা ও দরকষাকষির পর অবশেষে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ধাপে ধাপে শুল্ক সুবিধা ও নীতিগত সমন্বয়ের মাধ্যমে এ চুক্তি দেশের রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করবে এবং মার্কিন বাজারে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান
উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে চুক্তির
পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানানো হয়।
সরকার জানিয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ
দূতাবাস সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। চুক্তিতে
পণ্য ও সেবা বাণিজ্য,
কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ,
উৎপাদন নীতি, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা,
কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি
ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাসহ
বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নতুন চুক্তির ফলে বাংলাদেশি পণ্যের
ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমেছে।
ফলে শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে
কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা
হলো—যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা
তুলা ও কৃত্রিম তন্তু
ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি
পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে কোনো পাল্টা
শুল্ক আরোপ করা হবে
না। অর্থাৎ মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহৃত পোশাক রপ্তানিতে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায়
৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে ২ হাজার ৫০০
পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এর মধ্যে ওষুধ,
কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। অন্যদিকে,
বাংলাদেশে আমদানি হওয়া মার্কিন পণ্যের
ক্ষেত্রে ৭ হাজার ১৩২টি
শুল্ক কোড অন্তর্ভুক্ত করা
হয়েছে, যার অনেকগুলোর শুল্ক
ধাপে ধাপে হ্রাস পাবে।
সরকার জানিয়েছে, মার্কিন পণ্যের শুল্ক সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে
নির্বাচিত কিছু পণ্যে শুল্ক
কমানো হবে, পরবর্তী বছরগুলোতে
আরও পণ্যে তা সম্প্রসারিত হবে।
দীর্ঘমেয়াদে এ ব্যবস্থা রপ্তানি
খাতকে স্থিতিশীল করবে এবং শিল্প
ও উৎপাদন খাতের পরিকল্পনায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
মোট ৭১৩২টি শুল্ক কোডের মধ্যে ৪৯২২টি পণ্যের শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকেই শূন্য
করা হবে। এর মধ্যে
৪৪১টি পণ্যে ইতোমধ্যে শুল্ক শূন্য রয়েছে। আরও ১৫৩৮টি পণ্যের
শুল্ক পাঁচ বছরের মধ্যে
ধাপে ধাপে শূন্য হবে—প্রথম বছরে অর্ধেক এবং
বাকি চার বছরে সমান
হারে। এছাড়া ৬৭২টি পণ্যের শুল্ক দশ বছরের মধ্যে
শূন্য হবে; প্রথম বছরে
অর্ধেক কমিয়ে পরবর্তী নয় বছরে অবশিষ্ট
অংশ সমান হারে হ্রাস
করা হবে। তবে ৩২৬টি
পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। এর
মধ্যে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে
সম্পাদিত চুক্তির কিছু শুল্ক কোডও
রয়েছে।
চুক্তিতে ই-কমার্সের স্থায়ী
নীতিমালা, আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার সুরক্ষা, খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানি
সহজীকরণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও শিল্প খাতে
বিনিয়োগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শ্রম আইন হালনাগাদ
এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত পদক্ষেপ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কৃষিপণ্য আমদানি অনুমোদন, মার্কিন সনদের স্বীকৃতি ও বাণিজ্যিক শর্তাবলি
অনুসরণের বিষয়ও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। কোনো পক্ষ একতরফাভাবে
চুক্তি বাতিল করতে পারবে না—এমন বিধান রাখা
হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শর্তযুক্ত
চুক্তি বহির্গমন ধারা সংযোজন করা
হয়েছে।
সরকারি বিশ্লেষকদের মতে, এ পারস্পরিক
বাণিজ্য চুক্তি রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বিদেশি
বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক
স্থিতিশীলতা জোরদারে ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে পোশাক খাতসহ
অন্যান্য রপ্তানি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা
করছে সরকার।