১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৯ এ.এম

১% শুল্ক কমলেও প্রশ্ন হল: শর্তের ফাঁদে কী রপ্তানির ভবিষ্যৎ?

১% শুল্ক কমলেও প্রশ্ন হল: শর্তের ফাঁদে কী রপ্তানির ভবিষ্যৎ?

যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমেছে—কাগজে-কলমে এটি স্বস্তির খবর। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তবে এর প্রভাব সীমিত হতে পারে। যদিও মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শূন্য পাল্টা শুল্কের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তবু শর্ত ও ব্যয়ের হিসাব কষে অনেকে সতর্ক অবস্থানে।

নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। তবে রপ্তানিকারকদের মতে, মাত্র ১ শতাংশ কমায় সামগ্রিক রপ্তানিতে বড় ধরনের সুবিধা মিলবে না। তারা আশা করেছিলেন, শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। সেটি না হওয়ায় হতাশাও রয়েছে। পাশাপাশি, শূন্য পাল্টা শুল্ক সুবিধা পেতে তৈরি পোশাকে মার্কিন তুলা ব্যবহারের সত্যতা যাচাই কীভাবে হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। কঠোর শর্ত আরোপ করা হলে প্রত্যাশিত সুবিধা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। উপরন্তু, মার্কিন তুলার দাম তুলনামূলক বেশি এবং আমদানিতে সময়ও বেশি লাগে।

গত সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি সই করে বাংলাদেশ। এর পরই পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়। ফলে ২০ শতাংশ থেকে তা নেমে এসেছে ১৯ শতাংশে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের শুল্ক কিছুটা কমেছে, এতে অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করছেন। তবে এই চুক্তির জন্য যেসব অঙ্গীকার আমাদের করতে হয়েছে, তা নিয়ে আমার উদ্বেগ। সেই সঙ্গে চুক্তির সব বিষয় আমরা এখনো জানি না।’ তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ। এখন এই চুক্তির ভার বহন করতে হবে পরবর্তী সরকারকে। বিষয়টি তাদের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হবে।

প্রতিযোগীদের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকই ছিল ৭৫৫ কোটি ডলার। এছাড়া হোম টেক্সটাইল, টুপি/ক্যাপ, জুতা, প্লাস্টিক পণ্যও রপ্তানি হয়।

গত বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে তিন মাসের জন্য তা স্থগিত করা হয়। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই শুল্ক ৩৭ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। দর-কষাকষির পর ২ আগস্ট তা ২০ শতাংশে নামানো হয়, যা ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ; এর সঙ্গে যোগ হয় পাল্টা শুল্ক।

বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের ওপর ২০ শতাংশ, ভারতের ৫০ শতাংশ, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার ১৯ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ছিল। সম্প্রতি ভারতের হার কমে ১৮ শতাংশ হয়েছে। চীনের ক্ষেত্রেও কিছুটা কমানো হয়েছে। ফলে তৈরি পোশাক ছাড়া অন্যান্য পণ্যে যে বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা এখন সীমিত হয়ে আসছে।

এনপলি ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, পাল্টা শুল্ক আরোপ হওয়ার পর চীন থেকে জুতার ক্রয়াদেশ সরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিল অনেক মার্কিন ক্রেতা। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই জোয়ার অনেকটাই কমে গেছে। তার কারণ, চীনসহ প্রতিযোগী দেশের পাল্টা শুল্ক প্রায় কাছাকাছি। সাধারণত শুল্ক হ্রাস বা বৃদ্ধি হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। ১ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমার পর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার মানে, ১ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমানোয় তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না জুতা রপ্তানিতে।

মার্কিন তুলা: সুবিধা নাকি চাপ?

জুলাইয়ে পাল্টা শুল্ক কমানোর আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ। এরপর বেসরকারি খাত তুলা ও খাদ্যশস্য আমদানি শুরু করে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ১৭৫ কোটি কেজি তুলা আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাজিল থেকে ৪২ কোটি ২৬ কোটি কেজি এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১ কোটি ৯৩ লাখ কেজি তুলা এসেছে।

বর্তমানে ব্রাজিলের তুলার দাম প্রতি পাউন্ড ৭৭-৭৮ সেন্ট, আর মার্কিন তুলার দাম ৮৫-৮৭ সেন্ট। ব্রাজিল থেকে ঋণপত্র খোলার পর আড়াই মাসে তুলা আনা গেলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আনতে সময় লাগে প্রায় চার মাস—যা ব্যবসায়ীদের মূলধন দীর্ঘ সময় আটকে রাখে।

পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৫ হাজার টন তুলা আমদানি করেছে মোশাররফ গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দেশীয় বস্ত্রকলগুলো বর্তমানে ভারতীয় সুতার সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন তুলা আমদানি করে সুতা তৈরি করলে তাতে বস্ত্রকলের লোকসান আরও বাড়বে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৯৪ কোটি ডলারের ওভেন পোশাক এবং ২৬০ কোটি ডলারের নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে। নিট পোশাকের ৯০-৯৫ শতাংশ কাপড় দেশে তৈরি হলেও ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে ৬৫-৭০ শতাংশ কাপড় আমদানি করতে হয়। ফলে নিট খাতে মার্কিন তুলার ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হলেও ওভেন খাতে তা সীমিত।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, তৈরি পোশাকে মার্কিন তুলা ব্যবহারের বিষয়টি কীভাবে যাচাই হবে, সেটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। প্রক্রিয়াটি জটিল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবাই সুফল না–ও পেতে পারে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আজকে এক শুল্ক, কালকে আরেক। প্রতিযোগী দেশগুলো শুল্ক কমানোর চেষ্টা করছে। ফলে বর্তমান ব্যবস্থা কত দিন বজায় থাকে, তার ওপর প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে, শুল্ক কমার ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি এলেও শর্ত, ব্যয় ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় রপ্তানিকারকদের সামনে এখনো অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি।