ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ইসলাম যে আপসহীন—তা স্পষ্ট করে দেয় কোরআন ও হাদিস। দুর্বল, অসহায় ও নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষাকে ইসলামের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে তিনি নিজেই প্রতিপক্ষ হবেন।
হাদিসে বলা হয়েছে— “তিন শ্রেণির লোক আছে, কিয়ামতের দিন যাদের বিরুদ্ধে আমি নিজেই প্রতিপক্ষ হবো—
১. যে ব্যক্তি আমার নামে কোনো অঙ্গীকার বা চুক্তি করে, তারপর তা ভঙ্গ করে।
২. যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করে।
৩. এবং যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করে, তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে, কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২২৭)
যদিও আল্লাহ তাআলা সব জালিম ও অন্যায়কারীর বিরোধী, এই হাদিসে উল্লিখিত তিন শ্রেণির মানুষের কথা আলাদা করে বলা হয়েছে। কারণ, তাদের প্রত্যেকের অপরাধ সরাসরি আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
প্রথম শ্রেণির ব্যক্তি হলেন তিনি, যিনি আল্লাহর নামে কোনো অঙ্গীকার বা চুক্তি করার পর তা ভঙ্গ করেন। এর মধ্যে পড়ে আল্লাহর নামে শপথ করে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা, কিংবা তাঁর শরিয়তের আলোকে নিরাপত্তা বা আশ্রয় দেওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করা। কোরআনে এ ধরনের আচরণের কঠোর নিন্দা করে বলা হয়েছে— “যারা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যা সংযুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে, আর পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত।” (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭)
ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বাসঘাতকতা কখনোই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর তোমরা আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। আল্লাহকে জামিন করে শপথ দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত।” (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯১)
হাদিসেও বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহ পরিণতির কথা এসেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন— “কিয়ামতের দিন বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তির জন্য একটি পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং বলা হবে, এটি অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৩৫)
বিশ্বাসঘাতকতা কেবল ধর্মীয়ভাবে নিন্দিত নয়, এটি সুস্থ বিবেক, যুক্তি ও স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধেও। এর ক্ষতিকর প্রভাব ব্যক্তি জীবন ছাপিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আইন-শৃঙ্খলা ও জনস্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দ্বিতীয় শ্রেণির অপরাধ হলো কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য আত্মসাৎ করা। ইসলাম মানুষের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং একজন স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করাকে মহাপাপ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ ধরনের অপরাধের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার একটি মহান অধিকার লঙ্ঘিত হয়—যার কারণে ওই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহকে সরাসরি প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবে।
তৃতীয় শ্রেণির অপরাধী হলেন তিনি, যিনি শ্রমিককে কাজে নিয়োগ দিয়ে তার কাছ থেকে পূর্ণ সেবা গ্রহণ করেন, কিন্তু ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রদান করেন না। এ বিষয়ে রাসুল (সা.) স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন— “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৪৩)
এই হাদিসে শ্রমিকের মজুরি দ্রুত পরিশোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ইচ্ছাকৃত বিলম্বকে জুলুম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কোরআনে এ ধরনের জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে— “আর জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।” (সুরা : হজ, আয়াত : ৭১)
মানবিক আচরণে রাসুল (সা.) ছিলেন অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর দীর্ঘদিনের খাদেম আনাস (রা.) বলেন— “আমি ১০ বছর আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর খিদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে কখনো ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি; কখনো বলেননি, ‘তুমি এটা কেন করলে?’ বা ‘এটা কেন করনি?’।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩০৯)
সব মিলিয়ে ইসলামে অন্যায় সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অন্যায় মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ, শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন এবং ন্যায়সংগত অবস্থান থেকে বিচ্যুতি। তাই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, মানুষের স্বাধীনতা হরণ এবং শ্রমিকের অধিকার অস্বীকার—এসব অপরাধ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর। এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সম্মুখীন হতে হবে—এই সতর্কবার্তাই দেয় ইসলাম।