৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৩ পি.এম

নীরবে বাড়ছে প্রোস্টেট ক্যানসার: লক্ষণ ও চিকিৎসা

নীরবে বাড়ছে প্রোস্টেট ক্যানসার: লক্ষণ ও চিকিৎসা

নীরবে ধারাবাহিকভাবে পুরুষদের মধ্যে বাড়ছে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি—এমন বাস্তবতায় সতর্কতা ও প্রস্তুতির প্রশ্ন এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষদের মূত্রথলির নিচে অবস্থিত ছোট গ্রন্থি প্রোস্টেটে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থেকেই এই ক্যানসারের সৃষ্টি হয়।

বিশ্বজুড়ে পুরুষদের মধ্যে দ্রুত বিস্তারমান ক্যানসারগুলোর তালিকায় প্রোস্টেট ক্যানসার অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ায় একসময় তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোগটির প্রকোপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নগরজীবনের প্রসার, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং আধুনিক রোগনির্ণয় ব্যবস্থার উন্নয়ন—সব মিলিয়েই এই বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো অবকাঠামো ও প্রস্তুতি কি আমাদের যথেষ্ট আছে?

রোগনির্ণয়ে অগ্রগতি, তবে সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট

গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্তকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। পিএসএ (প্রোস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন) পরীক্ষা এখন অনেক জেলা শহরেই সহজলভ্য। রোগের ধাপ নির্ধারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মাল্টি-প্যারামেট্রিক এমআরআই সেবাও দেশের বহু হাসপাতালে চালু হয়েছে। পাশাপাশি ট্রাস গাইডেড বায়োপসি ও উন্নত হিস্টোপ্যাথলজি সেবার বিস্তার ঘটেছে।

তবে এই সুবিধাগুলোর বড় অংশ এখনো শহরকেন্দ্রিক। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং সংস্কৃতি না থাকায় বহু রোগী দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আরও বড় সীমাবদ্ধতা হলো পিএসএমএ পিইটি–সিটি—যা আধুনিক সময়ে প্রোস্টেট ক্যানসারের ধাপ নির্ণয় ও রোগ পুনরায় ফিরে আসা শনাক্তে বিপ্লব এনেছে—এই প্রযুক্তির প্রাপ্যতা এখনো খুবই সীমিত। সঠিকভাবে রোগের স্তর নির্ধারণ করা না গেলে কার্যকর চিকিৎসা পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হতে হবে

প্রোস্টেট ক্যানসার শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব। সাধারণত বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে দেরি না করে প্রোস্টেট পরীক্ষা করানো জরুরি—

• প্রস্রাব করতে সমস্যা হওয়া বা প্রস্রাবের পরও মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার অনুভূতি

• প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বের হওয়া

• ঘন ঘন প্রস্রাব, বিশেষ করে রাতে প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা

• তলপেটে ব্যথা বা অস্বস্তি

• হাড়ে ব্যথা, বিশেষ করে মেরুদণ্ডে ব্যথা

চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির ভূমিকা

প্রোস্টেট ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। এই চিকিৎসায় টিউমারে নির্দিষ্ট মাত্রার উচ্চ ডোজ প্রয়োগ করা যায়, একই সঙ্গে আশপাশের সুস্থ অঙ্গগুলো সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। দেশে আধুনিক লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর চালু হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইমেজ-গাইডেড রেডিওথেরাপির ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং হাইপোফ্র্যাকশনেশন পদ্ধতি চিকিৎসার সময় কমিয়ে রোগীর ভোগান্তিও হ্রাস করছে।

তবে চাহিদার তুলনায় রেডিওথেরাপি মেশিন এখনো অপর্যাপ্ত। সরকারি বড় হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা রোগীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি দক্ষ রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট ও রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্টের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। এসবিআরটির মতো অত্যাধুনিক চিকিৎসা সুবিধা এখনো হাতে গোনা কয়েকটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ। উন্নত ইমেজিং, অ্যাডাপটিভ প্ল্যানিং এবং রিয়েল-টাইম মোশন ম্যানেজমেন্টের পূর্ণ সমন্বয়ও এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোস্টেট ক্যানসারের বাড়তে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন আরও বিস্তৃত স্ক্রিনিং, গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমানো এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও জনবল উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।