প্রখ্যাত বাউলশিল্পী সুনীল কর্মকার আর নেই। লোকসংগীতের এই বরেণ্য শিল্পী শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
সুনীল কর্মকারের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বান্দনাল গ্রামে। মাত্র সাত বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। তবে শৈশব থেকেই গানের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। বাবা দীনেশ কর্মকার তাঁকে বাউলগুরু ইসরাইল মিয়ার কাছে নিয়ে যান। সেখানে সংগীতের তালিম নেওয়ার পাশাপাশি দোতারা বাজানোতেও দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। ১৫ বছর বয়সের মধ্যেই বেহালা, দোতারা, তবলা ও হারমোনিয়াম আয়ত্ত করে পুরোপুরি পেশাদার শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ভরাট ও আবেগময় কণ্ঠের অধিকারী সুনীল কর্মকার একাই যেকোনো আসর মাতিয়ে তুলতে পারতেন। গানের পাশাপাশি একাধিক বাদ্যযন্ত্রে তাঁর পারদর্শিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিংবদন্তি বাউলশিল্পী ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর গান শুনেই সংগীতজগতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেন তিনি।
ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর অসংখ্য গানে সুরারোপ ও কণ্ঠ দিয়েছেন সুনীল কর্মকার। এর মধ্যে অনেক গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করে। নিজের লেখা গানের সংখ্যা দেড় শ থেকে দুই শর কাছাকাছি। টেলিভিশন চ্যানেল, যাত্রাপালা, মঞ্চ ও সিনেমায় তিনি পেশাদার শিল্পী হিসেবে নিয়মিত গান পরিবেশন করেছেন।
লোকসংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রদত্ত শিল্পকলা পদক লাভ করেন এই দৃষ্টিহীন শিল্পী।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “উনি দীর্ঘকাল ধরে বাউল ও লোকসংগীতের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক চেতনার বাণী পৌঁছে দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, সুনীল কর্মকার শুধু একজন কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ ধারক। একতারা ও দোতারার তালে তাঁর কণ্ঠের বিশেষ আবেদন শ্রোতাদের গভীরভাবে মুগ্ধ করত। তাঁর গানে বারবার উঠে এসেছে জীবনদর্শন, মানবপ্রেম এবং স্রষ্টার প্রতি ভক্তির কথা। সংগীতই ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান। বিশেষ করে “মানুষ ধরো, মানুষ ভোজ”—ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর সেই বিখ্যাত গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
কেন্দুয়া জালাল পরিষদের সদস্য আয়েশ উদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, “বাউল সুনীল কর্মকার জালাল ভাবশিষ্য এবং কালজয়ী বাউল শিল্পী ছিলেন। তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।”