দেশে নিপাহ ভাইরাস যেন আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এই প্রাণঘাতী ভাইরাস এখন তিনটি নতুন ও উদ্বেগজনক বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছে—গত দুই বছরে আক্রান্ত সব রোগীর মৃত্যু, আগের চেয়ে বেশি এলাকায় বিস্তার এবং প্রথমবারের মতো গরম মৌসুমে সংক্রমণের ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, আগে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ৭০ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু সর্বশেষ দুই বছরে এই হার দাঁড়িয়েছে শতভাগে। অর্থাৎ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যারা নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের কেউই বেঁচে নেই।
দ্বিতীয় উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও নিপাহ ভাইরাস এখন আগের চেয়ে বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। আর তৃতীয় নতুন বৈশিষ্ট্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে মৌসুমি পরিবর্তন—শীতকাল ছাড়াও গরমের সময়েও এখন সংক্রমণ ঘটছে।
এত ঝুঁকির পরও দেশে খেজুরের রস বিক্রি ও পান বন্ধ হয়নি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খেজুরের রস বিক্রির প্রচার আগের মতোই চলতে দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহ প্রতিরোধে খেজুরের রসের বাণিজ্যিক বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি। এ জন্য কঠোর আইন প্রয়োজন হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
নিপাহ একটি মারাত্মক ও সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যার বাহক টেরোপাস প্রজাতির ফলভুক বাদুড়। বাদুড়ের লালা বা মল-মূত্রের মাধ্যমে খেজুরের রস, তালের রস কিংবা আধা খাওয়া ফলের সঙ্গে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। জ্বর, মাথাব্যথা, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, আচরণগত পরিবর্তন এবং কখনো শ্বাসকষ্ট—এসবই নিপাহ সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ। সংক্রমিত মানুষ বা প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শেও রোগটি ছড়াতে পারে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৩৪৭ জন নিপাহ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুহার ৭২ শতাংশেরও বেশি। তবে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শনাক্ত হওয়া সব রোগীরই মৃত্যু হয়েছে।
আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, “২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৫ সালে চারজন রোগী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তাঁরা সবাই মারা যান। এর আগে কোনো বছরে শতভাগ মৃত্যু হয়নি।”
বাংলাদেশে প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয় ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায়। এরপর ২০০৩ সালে নওগাঁয় রোগী পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটে ২০০৪ সালে ফরিদপুরে—সে বছর সেখানে ৩৫ জন আক্রান্ত হন এবং ২৭ জনের মৃত্যু হয়।
নিপাহ সাধারণত শীতকালে খেজুরের রসের মাধ্যমে ছড়ালেও ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো গরমের সময় সংক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গত বছরের আগস্টে এক রোগীর মৃত্যু হয় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে।
এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, “বাদুড়ে খাওয়া পেয়ারা খাওয়ার ফলে ওই ব্যক্তি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ খেজুরের রসের বাইরে অন্য ফল খাওয়ার ফলেও নিপাহ ছড়াচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে, নিপাহ এখন শীতকাল ছাড়াও গরমেও ছড়াচ্ছে। এটা শঙ্কাজনক।”
ভৌগোলিক বিস্তৃতিও বাড়ছে নিপাহের। আগে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি থাকলেও এখন নতুন নতুন জেলা যুক্ত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ, মধ্যাঞ্চলের ফরিদপুর ও পশ্চিমাঞ্চলের মেহেরপুরের পাশাপাশি ২০২৪ সালে শরীয়তপুর এবং ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ভোলা জেলায় নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
শারমিন সুলতানা বলেন, “এখন পর্যন্ত দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। নতুন নতুন এলাকায় এখন ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাস। এটা একটা বিপদের লক্ষণ।”
খেজুরের রস নেট বা জাল দিয়ে ঢেকে নিরাপদ রাখার প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ অবাস্তব বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আইইডিসিআর ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের যৌথ নিপাহ সার্ভিলেন্স কার্যক্রমের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ মঈনুদ্দীন সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, “বাদুড়ের প্রস্রাব ধরে রাখার প্রকোষ্ঠ অনেক ছোট। তাই যখন বাদুড় রস পান করে, তখনই প্রস্রাব করতে থাকে। আর নেট দিয়ে পানি কী ধরে রাখা সম্ভব? কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই রস নিরাপদ রাখার যে কথা বলা হচ্ছে, তা শতভাগ ভুল।”
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নিপাহ ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় খেজুরের কাঁচা রস পান ও এর বিজ্ঞাপন—দুটোই বন্ধ করতে হবে। এ জন্য আইন প্রণয়ন জরুরি। ডা. মুশতাক হোসেন জানান, আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে একাধিকবার সরকারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একমত হলেও প্রয়োজনীয় আইনি উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি।