বিশ্বকাপকে ঘিরে যে অস্বাভাবিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল—এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনের অভিজ্ঞ মহল। বাংলাদেশ নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানো, সেই সিদ্ধান্তে আইসিসির অনড় অবস্থান, আর এর জেরে পাকিস্তানের ভারত ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বড় ধরনের আর্থিক ও কূটনৈতিক সংকটের দিকে যাচ্ছে। এই জটিলতার সূচনালগ্নে ছিল বিসিসিআইয়ের এক সিদ্ধান্ত, আইপিএল থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া।
আইসিসির সাবেক হেড অব কমিউনিকেশন্স এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সাবেক মিডিয়া ডিরেক্টর সামি-উল-হাসান বার্নি মনে করেন, বিষয়টি শুরুতেই সঠিকভাবে সামলানো গেলে এত বড় বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব ছিল। তিনি বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন,
‘ক্রিকেট প্রশাসকরা যদি আরও সতর্ক হতেন এবং কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দিতে হবে— এমন প্রকাশ্য বিবৃতি না দিতেন, তবে এই পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো যেত।’
বার্নির মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি নীরবে সম্পন্ন করা যেত। তিনি বলেন,
‘তাদের এটি জনসমক্ষে ঘোষণা করার প্রয়োজন ছিল না। ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ব্যক্তিগতভাবে জানানো যেত, খেলোয়াড়কে ছেড়ে দেওয়া যেত এবং বিষয়টি এতদূর গড়াত না।’
বিসিসিআইয়ের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন,
‘কখনো কখনো বিচার-বুদ্ধির ভুল এমন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায় যার প্রভাব অনেক বিস্তৃত হয়। ৩ জানুয়ারির ঘোষণাটি এই পরিস্থিতির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
পাকিস্তানি দৈনিক ডন-এর সাবেক সাংবাদিক বার্নি আইসিসির দুবাই সদর দপ্তরে এক দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পিসিবি চেয়ারম্যানের অবস্থান এবং এর পেছনের যুক্তিও ব্যাখ্যা করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারত সরকার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে পাকিস্তানে ভারতীয় দল পাঠানোর অনুমতি দেয়নি। অথচ একই ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আইসিসি বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেয়। এই ভিন্ন আচরণই পাকিস্তানের অসন্তোষের মূল কারণ বলে মনে করেন বার্নি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
‘তিনি (সংশ্লিষ্ট পক্ষ) মনে করেন যে জানুয়ারিতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যখন একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তখন একই নীতি প্রয়োগ করা হয়নি। এখানেই দ্বিমুখী নীতি বা ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।’
ভারত–বাংলাদেশ বিরোধে পাকিস্তানের ভূমিকা কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নে বার্নির মন্তব্য,
‘আমরা একমত হতে পারি বা না-ও পারি, কিন্তু যখন একটি সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান বিষয়ের বাইরের অনেক বিষয় বিবেচনা করে।’
আইসিসি ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, পিসিবিকে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে, যার মধ্যে আর্থিক জরিমানা ও রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। তবে বার্নি বলেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাকিস্তান সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে অবগত ছিল। তার ভাষায়,
‘এগুলো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। অবশ্যই আইনি এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।’
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ফলে সব দিক বিবেচনায় ক্ষতির অঙ্ক ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বার্নি উল্লেখ করেন,
‘পাকিস্তানের বার্ষিক আয় প্রায় ৩৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, তাই এই (ক্ষতির) পার্থক্যটি অনেক বিশাল।’
তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতেও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট মোকাবিলা করেছে। প্রায় দুই দশক ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ না খেলাসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা টিকে ছিল। বার্নি বলেন,
‘তারা ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিদেশের মাটিতে (সংযুক্ত আরব আমিরাতে) তাদের হোম ম্যাচগুলো খেলেছে এবং তারপরও ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মতো বড় টুর্নামেন্ট জিতেছে। তাই আর্থিক প্রভাব পড়বে ঠিকই, তবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড অতীতে দেখিয়েছে যে তারা এই ধরনের চাপের মধ্যে টিকে থাকতে পারে।’