৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৩ পি.এম

চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন দাম মার্কিন ডলারের, সামনে আরও পতনের শঙ্কা—কারণ কী?

চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন দাম মার্কিন ডলারের, সামনে আরও পতনের শঙ্কা—কারণ কী?

বছরের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেয়েছে মার্কিন ডলার। ২০২৫ সাল শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থান ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মুদ্রাবাজারে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেই অস্থিরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর ডলারের মান নেমে এসেছে গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

গত মঙ্গলবার বিভিন্ন প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি পরিমাপকারী সূচক চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছায়। ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের তুলনায় ডলারের দর ছিল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল। মাত্র এক সপ্তাহেই ডলারের মান কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।

যদিও গত দু–এক দিনে পতনের গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে, বিশ্লেষকদের মতে এই স্বস্তি সাময়িক। ডাচ ব্যাংক আইএনজির আর্থিক বাজার গবেষণা বিভাগের প্রধান ক্রিস টার্নার বলেন, “বেশির ভাগ মানুষই মনে করছেন এই বছর ডলারের মান আরও কমবে। পতনটা কখন ঘটবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ডলার যে দুর্বল হচ্ছে—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”

ডলার দুর্বল হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর। বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া আমেরিকানরা ইতোমধ্যে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন। পাশাপাশি ডলারের দরপতন অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।

এই পরিস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারের যে একক আধিপত্য ছিল, তা কি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে? এই আধিপত্যের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এতদিন তুলনামূলক কম খরচে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিতে পেরেছে।

কেন হঠাৎ এই দুর্বলতা

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ডলার ছিল শক্ত অবস্থানে। বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অতিমারি–পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ সুদের হার ডলারকে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।

তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে গত বছর থেকেই। বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান নির্দেশক সূচক ২০২৪ সালে প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়, যা ২০১৭ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ উপলক্ষে শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর থেকেই ডলারের এই দরপতনের গতি স্পষ্ট হয়।

চলতি মাসে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বাড়ার পর ডলারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বাজারে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই ডলারকে দুর্বল করার পথে হাঁটতে পারে। জাপানের মুদ্রা ইয়েনকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে ডলার বিক্রি করতে পারে—এমন আলোচনাও ডলারের দর কমাতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিই কি মূল কারণ?

বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, ডলারের এই দুর্বলতার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা অন্যতম কারণ। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাবেক কৌশলবিদ ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো রবিন ব্রুকস বলেন, “বাজার আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের অগোছালো ও অস্থির নীতির প্রতিক্রিয়ায় এভাবে সাড়া দিচ্ছে। এই তারা কঠোর হচ্ছে, আবার পরক্ষণেই নরম হচ্ছে।” শুল্কনীতি ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

রবিন ব্রুকসের মতে, ডলারের পতন মূলত বাজারের একটি সতর্কবার্তা। তার ভাষায়, বাজার বলতে চাইছে, “যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশৃঙ্খল বা অস্থির অবস্থান অন্য কারও চেয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বেশি ক্ষতি বয়ে আনছে।”

আরও যেসব কারণ চাপ বাড়াচ্ছে

ডলারের দুর্বলতার পেছনে আরও কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি বাজারে বিনিয়োগের তুলনামূলক ভালো সুযোগ তৈরি হওয়া। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের বন্ড বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা ডলারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

জাপানি বন্ড বাজারে ধসের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ডলার ও ইয়েনের সুদের পার্থক্যের সুযোগ নিয়ে করা ‘ক্যারি ট্রেড’ থেকে বিনিয়োগ তুলে নিতে শুরু করেছেন। এতে ডলার বিক্রির চাপ আরও বেড়েছে।

তবে চলতি সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইয়েনকে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের খবর অস্বীকার করেন। তার বক্তব্যে বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

এই অনিশ্চয়তাই ডলারের ভবিষ্যৎকে আপাতত ঝাপসা করে রেখেছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র- বিবিসি