৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৭ পি.এম

১২,৩৭১ কোটি টাকা দাবি করলেও বাংলাদেশকে অর্ধেক ক্ষতিপূরণ দিবে নাইকো

১২,৩৭১ কোটি টাকা দাবি করলেও বাংলাদেশকে অর্ধেক ক্ষতিপূরণ দিবে নাইকো

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত রায় সামনে এসেছে। বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (ইকসিডে) প্রদত্ত রায়ে বাংলাদেশ প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ পেতে পারে, যা বর্তমান বিনিময় মূল্যে আনুমানিক ৫১২ কোটি টাকার সমান। এই অর্থ পরিশোধ করবে কানাডীয় প্রতিষ্ঠান নাইকো রিসোর্সেস।

জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনজীবীদের মাধ্যমে পাওয়া রায়ের সংক্ষিপ্তসার থেকেই ক্ষতিপূরণের এই অঙ্ক সম্পর্কে ধারণা মিলেছে। তবে এখনো রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ রায় হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীদের মতামত নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

এর আগে টেংরাটিলায় গ্যাস পুড়িয়ে ফেলা এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য বাংলাদেশ সরকার ও বাপেক্স যৌথভাবে ইকসিডেতে মোট ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। কর্মকর্তাদের মতে, ঘোষিত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দাবিকৃত অর্থের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কারণ বিস্ফোরণে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক, পাশাপাশি দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনায় বড় অঙ্কের ব্যয়ও হয়েছে।

ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের খবর প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিস্তারিত রায় দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ২০০৩ সালে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নাইকো রিসোর্সেসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। খননকাজ শুরু হওয়ার পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন সেখানে পরপর দুটি বড় বিস্ফোরণ ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে গ্যাসক্ষেত্রের বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায় এবং আশপাশের স্থাপনা ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলা ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও নাইকো তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

পরবর্তী সময়ে, ২০০৭ সালে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা দেশের আদালতে মামলা করে। মামলাটি হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ালেও উভয় ক্ষেত্রেই পেট্রোবাংলার পক্ষে রায় আসে। একই সময়ে নাইকোর গ্যাস বিল পরিশোধ স্থগিত রাখা হয় এবং বাংলাদেশে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০২০ সালে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, ২০১০ সালে নাইকো নিজেদের দায়মুক্তির দাবিতে ইকসিডেতে সালিসি মামলা করে। এর জবাবে বাপেক্স ও বাংলাদেশ সরকার পৃথকভাবে ক্ষতিপূরণের দাবি তোলে। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণের দাবি দাঁড়ায় ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা জানান, ইকসিডেতে শুনানিকালে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ও দায় নির্ধারণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে। অতীতে রায় সংক্রান্ত তথ্য আগাম প্রকাশ পাওয়ায় গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও ওঠে। সে কারণেই এবার পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা হচ্ছে না।

২০০৮ সালে দেশে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণের সময় তেল–গ্যাস–খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ–বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, টেংরাটিলায় ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কমিটির সাবেক সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ ও মামলা পরিচালনায় শুরু থেকেই দুর্বলতা ছিল। তবে নাইকোর দায় প্রমাণ হওয়াটা নৈতিক বিজয়।’

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও বলেন, দাবির তুলনায় প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক হতাশাজনক। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর তা খতিয়ে দেখা হবে এবং মামলা পরিচালনায় মোট ব্যয়ের হিসাবও পর্যালোচনা করা হবে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যান্য স্তর ও অংশে গ্যাসের মজুত অক্ষত রয়েছে। সেখানে নতুন কূপ খননের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব প্রস্তুত রয়েছে। ইকসিডের চূড়ান্ত রায় হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।