২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৩ পি.এম

সাত কলেজ থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়: আমিনুল ইসলামের কলাম

সাত কলেজ থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়: আমিনুল ইসলামের কলাম

আমি নিজের কানে শুনেছি—ভাইভা বোর্ডে থাকা ভদ্রলোক তাঁর সামনে বসে থাকা চাকরি প্রার্থী ছেলেটার সার্টিফিকেট দেখে বলছেন,
“তুমি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো নাই। আবার সার্টিফিকেট তো দেখছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের!”

এই বলে তিনি হাসাহাসি করেছেন ছেলেটার সামনেই। আমিও ওই ভাইভা বোর্ডে এক্সপার্ট হিসেবে ছিলাম। অথচ ছেলেটা একবারের জন্যও বলে নাই, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি।” বরং সে প্রথম থেকেই বলেছে, “আমি ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করেছি।”

এরপরও পুরোটা সময় ওই ছেলেটার সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। যেখানে তাঁর কোন হাত নেই। ঢাকার সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। তাই সার্টিফিকেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই দেয়া হয়।

এই ঘটনা যদি ইউরোপের কোন দেশে ঘটতো, ওই ছেলে চাইলেই ভাইভা বোর্ডে বসে থাকা ওই ভদ্রলোকের নামে মামলা করে দিতে পারতো। ওই ভদ্রলোক হয়ত বৈষম্য করার জন্য পুরো জীবনে আর কোন দিন কোথাও চাকরি করতে পারতো না। অথচ বাংলাদেশে হরহামেশা এইসব ঘটে।

সিলেটের সাস্টে পড়ার সময় নিজ কানে শুনেছি আমার ক্লাসমেটরা এমসি কলেজের শিক্ষার্থীদের কী ছোট করে কথা বলতো! মনে হয়, ওরা মানুষই না। “ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ে! এরা কোন দুঃখে মানুষ হতে যাবে?” ভাবটা এমন।

বিশেষ করে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের তো কোন দোষ ছিল না। ওরা তো নিজেরা নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত করেনি। অথচ যেখানেই যায়, ওদের এই সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশ্ন করা হতো।

আজ ওরা মুক্ত হয়েছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ উপদেষ্টা পরিষদে পাশ হয়েছে। আশা করি প্রেসিডেন্ট খুব দ্রুত সাইন করে দেবেন। ঢাকায় আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া আসলে সেই অর্থে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু এরপরও আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি হবার ব্যাপারে মতামত দিয়েছি—স্রেফ এই শিক্ষার্থীগুলোর কষ্ট দেখে।

গতকাল গিয়েছিলাম কবি নজরুল কলেজ মঞ্চে। গিয়ে কী দেখি জানেন? শুধু শিক্ষার্থীরা বসে বসে নিজেদের দাবি জানাচ্ছে। একজন শিক্ষকও নাই সেখানে। মানে একজনও না। এই শিক্ষার্থীরা তো আমাদেরই সন্তান। কলেজে পড়ে বলেও আপনারা ফিরেও তাকালেন না?

এতটা বৈষম্য কী করে একটা সমাজে চলতে পারে আমার ঠিক জানা নেই। যা হোক, তোমরা যারা নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী হবে কিংবা নতুন শিক্ষক বা কর্মকর্তা হবেন—দয়া করে জীবনে কোন দিন কারও সাথে বৈষম্য করবেন না। নিজেদের এলিট বলে দাবি করবেন না।

সম্ভব হলে—এই যে গত দেড় বছরের স্ট্রাগল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইউজিসির সদস্য তানজিমুদ্দিন স্যার, শিক্ষার্থী আবদুর রহমান, জাকারিয়া সহ আমরা আরও অনেকেই এই অসম লড়াইয়ে ছিলাম। সম্ভব হলে এই গল্পগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস হিসেবে (লিখিত) রেখে দেবেন। যাতে ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করতে পারে, কারন বর্তমান শিক্ষার্থীরা তাঁদের জন্য লড়াই করেনি। করেছে ভবিষ্যতে যারা আসবে—তাদের যেন এই বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।

লেখক: আমিনুল ইসলাম