মানব সভ্যতার ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ হলো ইন্দোনেশিয়ার মুনা দ্বীপে। চুনাপাথরের এক গুহায় প্রায় ৬৭ হাজার ৮০০ বছরের পুরোনো হাতের ছাপ আবিষ্কার করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা, যা এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) গবেষকেরা জানান, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ গবেষণা দলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গুহার দেয়ালে হাত রেখে তার ওপর রঞ্জক পদার্থ ফুঁ দিয়ে এই নকশা তৈরি করা হয়েছিল। এতে দেয়ালের ওপর মানুষের হাতের স্পষ্ট বহিরেখা ফুটে উঠেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এই আবিষ্কার আগের সব রেকর্ড ভেঙে মানবজাতির শিল্প ইতিহাসকে আরও বহু হাজার বছর পেছনে নিয়ে গেছে।
জাকার্তা পোস্ট জানায়, ইন্দোনেশিয়ার ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন এজেন্সির (বিআরআইএন) প্রত্নতাত্ত্বিক আধহি অগাস ওক্তাভিয়ানা ২০১৫ সাল থেকে সুলাওয়েসি প্রদেশের মুনা দ্বীপে এই ধরনের হাতের ছাপের সন্ধান চালিয়ে আসছিলেন। গুহার ভেতরে অপেক্ষাকৃত নতুন কিছু চিত্রের নিচে—যেখানে ঘোড়ায় চড়া একজন মানুষ ও একটি মুরগির ছবি ছিল—এই প্রাচীন ছাপগুলোর সন্ধান মেলে।
প্রথমদিকে এই অস্পষ্ট নকশাগুলো মানুষের আঙুলের ছাপ—এটি প্রমাণ করা সহজ ছিল না। পরে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে আঙুলের ডগার মতো কিছু অংশ শনাক্ত করা হয়, যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা সূক্ষ্মভাবে আঁকা হয়েছিল।
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ম্যাক্সিম অ্যাবার্ট বলেন, এসব হাতের ছাপ সুলাওয়েসির একটি স্বতন্ত্র শৈল্পিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। তার মতে, প্রাচীন শিল্পীরা আঙুলের ডগাগুলো অত্যন্ত যত্ন নিয়ে পুনর্গঠন করেছিলেন, যাতে সেগুলো আরও সূক্ষ্ম দেখায়।
সহ-লেখক অ্যাডাম ব্রাম ধারণা করেন, প্রাচীন মানুষেরা হয়তো হাতের অবয়বকে অন্য কিছুর—যেমন পশুর নখরের—রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এর পেছনে গভীর কোনো সাংস্কৃতিক বা প্রতীকী অর্থ থাকতে পারে, যা মানুষের সঙ্গে প্রাণিজগতের সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
চিত্রগুলোর বয়স নির্ধারণে গবেষকেরা ব্যবহার করেন ‘ইউরেনিয়াম সিরিজ ডেটিং’ পদ্ধতি। গুহার দেয়ালে পিগমেন্টের ওপর জমে থাকা ক্যালসাইট স্তর থেকে নমুনা নিয়ে লেজারের মাধ্যমে ইউরেনিয়ামের ক্ষয়ের হার বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, এই গুহাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পচর্চার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এবং কোনো কোনো চিত্রের ওপর প্রায় ৩৫ হাজার বছর পর আবার নতুন ছবি আঁকা হয়েছে।
নতুন এই আবিষ্কারটি ২০২৪ সালে একই দলের সুলাওয়েসিতে পাওয়া গুহাচিত্রের চেয়েও ১৫ হাজার বছরের বেশি পুরোনো। এতে সুলাওয়েসি হয়ে আদিম মানুষের অভিবাসনের তত্ত্ব আরও জোরালো হলো।
আধহি অগাস ওক্তাভিয়ানা বলেন, এসব চিত্র প্রমাণ করে আমাদের পূর্বপুরুষরা শুধু দক্ষ নাবিকই ছিলেন না, তারা ছিলেন অত্যন্ত নিপুণ শিল্পীও। গবেষকেরা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সংস্কৃতি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন।
এর আগে উত্তর-পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মুরুজুগায় প্রায় ৫০ হাজার বছরের পুরোনো প্রস্তর খোদাই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় স্থান পায়। ইন্দোনেশিয়ার এই নতুন সন্ধান আদিম মানুষের শিল্পবিকাশের ইতিহাসকে আরও প্রাচীন প্রমাণ করল।