বাঙালির চিরাচরিত শীতকালীন ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুরের রস। কিন্তু গত দুই দশকে এই সুস্বাদু পানীয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণে গত দুই বছরে বাংলাদেশে আক্রান্তদের সবার মৃত্যু হওয়ার বিষয়টি পরিস্থিতিকে চরম উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার এই ভাইরাসের ভয়াবহতা ও প্রতিকার নিয়ে বিশদ সতর্কতা প্রদান করেছেন।
নিপাহ মূলত একটি প্রাণিবাহিত ভাইরাস, যা ফলখেকো বাদুড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম এই রোগ শনাক্ত হলেও বাংলাদেশে ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় প্রথম এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। সাধারণত শীতকালে খেজুরের রস সংগ্রহের সময় রসের হাঁড়িতে বাদুড় মুখ দিলে তাদের লালা বা মলমূত্রের মাধ্যমে এই ভাইরাস রসে মিশে যায়। সেই কাঁচা রস পান করলেই মানুষ আক্রান্ত হয়। তবে বর্তমানে কেবল শীতকাল নয়, বরং সারা বছরই এই ভাইরাসের ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের আগস্টে নওগাঁয় এক শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই।
আইইডিসিআর-এর ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে বর্তমানে ৩৫টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই মারা গেছেন, অর্থাৎ বর্তমানে এই রোগে মৃত্যুর হার শতভাগ। খেজুরের রসের পাশাপাশি বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল যেমন—আম, পেয়ারা বা জাম খাওয়ার মাধ্যমেও মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে লালা বা কফের মাধ্যমে সুস্থ মানুষও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রায় ২৮ শতাংশ সংক্রমণের কারণ হিসেবে রোগীর সেবা করা বা তার কাছাকাছি থাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা এবং বমি ভাব দেখা দেয়। দ্রুত এটি ফুসফুসে আক্রমণ করে তীব্র শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর মস্তিষ্কে আক্রমণ বা এনসেফালাইটিস, যার ফলে রোগী প্রলাপ বকে, খিঁচুনি হয় এবং খুব দ্রুত কোমায় চলে যায়। যেহেতু এই রোগের এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা কার্যকর ওষুধ নেই, তাই দ্রুত শনাক্তকরণ এবং আইসোলেশন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সেবার সময় অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে এবং ব্যবহৃত সামগ্রী আলাদা রাখতে হবে।
এই মরণঘাতী রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো অবস্থাতেই কাঁচা খেজুরের রস পান করা যাবে না। রস পান করতে হলে অবশ্যই তা ফুটিয়ে নিতে হবে, কারণ উচ্চ তাপে এই ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যায়। এছাড়া গাছ থেকে পড়া বা পাখির কামড়ানো কোনো ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। শীতের আনন্দ যেন বিষাদে রূপ না নেয়, সেজন্য এক গ্লাস কাঁচা রসের মোহে নিজের ও পরিবারের জীবন ঝুঁকির মুখে না ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।