বিজ্ঞান কী বলছে
আধুনিক গবেষণা বলছে, এই ধারণার পেছনে কিছু বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, জীবনের শুরুতেই যারা প্রাকৃতিক পরিবেশের সংস্পর্শে আসে—যেমন মাটি, গাছপালা বা খোলা পরিবেশ—তাদের মধ্যে অ্যালার্জি ও কিছু অটোইমিউন রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। অটোইমিউন রোগ এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত নিজের কোষকেই শত্রু হিসেবে আক্রমণ করে।
গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, খুব অল্প বয়সে ক্ষতিকর নয় এমন ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে পরিচিত হলে ইমিউন সিস্টেম অকারণে অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে না। ফলে শরীর ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—কোনটি শত্রু আর কোনটি নিরীহ।
জন্মের পর শিশুর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা একদিনে পূর্ণতা পায় না। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শেখে, কোন জীবাণুকে প্রতিরোধ করতে হবে আর কোনটিকে উপেক্ষা করা নিরাপদ। ক্ষতিকর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া যেমন জরুরি, তেমনি উপকারী বা ক্ষতি না করা জীবাণুর বিরুদ্ধে অযথা প্রতিক্রিয়া না দেখানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই শেখার প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে অন্ত্রে থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া—যাদের একত্রে বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োম। এসব ব্যাকটেরিয়া শুধু রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতেই সাহায্য করে না, বরং কিছু প্রয়োজনীয় ভিটামিন উৎপাদন এবং খাবার হজমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর জীবনের প্রথম বছরটি মাইক্রোবায়োম গঠনের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। স্বাভাবিক প্রসবের সময় শিশু মায়ের শরীর থেকে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে। বুকের দুধের মাধ্যমেও সে নানা ভালো ব্যাকটেরিয়া পায়। পরে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটি, গাছপালা, পশুপাখি ও আশপাশের পরিবেশের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য আরও বাড়ে।
২০০৩ সালে বিজ্ঞানীরা একটি ধারণা তুলে ধরেন, যাকে বলা হয় ‘পুরোনো বন্ধু তত্ত্ব’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, শৈশবে যত বেশি নিরীহ ও বৈচিত্র্যময় ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসা যায়, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তত ভালোভাবে বন্ধু ও শত্রুর পার্থক্য করতে শেখে। এখানে ‘পুরোনো বন্ধু’ বলতে বোঝানো হয় সেই সব ব্যাকটেরিয়াকে, যারা আমাদের শরীরের ভেতরে বা ওপরে বাস করে, কিন্তু কোনো ক্ষতি করে না।
এর পাশাপাশি আলোচিত আরেকটি ধারণা হলো ‘হাইজিন হাইপোথিসিস’। এই তত্ত্ব বলছে, অতিরিক্ত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বড় হলে শিশুরা প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়, যার ফলে পরবর্তীতে অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বিষয়টি শুধু কম বা বেশি ব্যাকটেরিয়ার নয়—বরং কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়। প্রাকৃতিক ও নিরীহ ব্যাকটেরিয়া উপকারী হলেও রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু কখনোই নয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রাম বা খামার এলাকায় বড় হওয়া শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জির হার শহরের শিশুদের তুলনায় কম। একই প্রবণতা দেখা গেছে পোষা প্রাণী আছে—এমন পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের ক্ষেত্রেও। অন্যদিকে, জীবনের শুরুতেই অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার—যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে—বা সিজারিয়ান ডেলিভারির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জির ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।