স্বদেশে ফেরা ও আইন বাতায়ন
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আইন ও ইতিহাসের কাছে চিরাচরিত কিছু আবেদন সৃষ্টি করে। জন্ম-পরিক্রমা থেকেই আন্তর্জাতিক আইনে বাঙলাদেশ কিছু সুন্দরতম উদহারণ হয়েছে। সুতরাং সে সময় চেহারায় 'গরিব' হলে কি হবে, এই দেশের স্বাধীনতা ও আইনি-ঐতিহ্য অনেক ঋদ্ধ। রবীন্দ্রনাথের "যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক" গানে সুন্দর একটি কথা আছে:
"কে বলে তোর দরিদ্র ঘর, হৃদয় তোর রতনরাশি।"
আমাদের দেশজ-মনন তাই রতনে ভরপুর। আমি যেহেতু আইনের তালেবে এলেম, তাই বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আন্তর্জাতিক আইনি তাৎপর্য নিয়ে এখানে কয়েকটি কথা বলছি।একটু ভেবে দেখলে অনুধাবন করা যায় যে, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ ফিরে আসার মধ্যে আন্তর্জাতিক আইনের কতকগুলো নিগূঢ় অর্থ নিহিত আছে:-
অ.
মিয়ানওয়ালি থেকে ছেড়ে দেবার আগে ভুট্টো মুজিবকে একটি কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। শেখ মুজিব সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল না হয়ে সেদিন
যদি কনফেডারেশন গোছের কোনো কিছুতে রাজি হয়ে যেতেন, তাহলে পাকিস্তান সেটিকে ব্যবহার করে বাঙলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্ন তুলতে থাকতো। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা স্বীকৃতি পেতাম না।
আ.
লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বাঙলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অনুরোধ করেন। মুজিবের সঙ্গে হিথের এক ঘন্টা কথা হয়। মুজিবের সাথে বৈঠকের দিন-দুই-তিনেকের মধ্যে হিথ এ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে চিঠি ল্যাখেন। ওই চিঠির কপি এখন ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। চিঠিতে হিথ বাঙলাদেশকে দ্রুত স্বীকৃতি দেবেন বলে ইঙ্গিত দ্যান, এবং আমেরিকাকে অনুরোধ করেন তারাও য্যানো অন্তত ভুট্টোকে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে চাপ দেন।
লন্ডন বাঙলাদেশকে স্বীকৃতি দ্যায় ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২।
এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র এক মাসের মধ্যে ৩১টি দেশ এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ প্রাপ্তিকালে ৮৬টি দেশ বাঙলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, সদ্য স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা স্থায়ী করতে মুজিবের ব্যক্তিত্ব একেবারে প্রথম দিন থেকেই কাজ করেছিল। মন্টিভিডিও কনভেনশন ১৯৩৩ মতে, স্টেটহুড অর্জনে স্বীকৃতির গুরুত্ব আন্তর্জাতিক আইনের শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। মনে না থাকলে, জে জি স্টার্কের আন্তর্জাতিক আইন বইয়ের 'রাষ্ট্র স্বীকৃতি' চ্যাপ্টারটি আবার পড়ে নেওয়া যেতে পারে।
ই.
দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে হাজারো মানুষের সমাবেশে বক্তৃতা দেবার আগে, বিমানবন্দরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধীর সাথে বঙ্গবন্ধুর আলাপ হয়। সম্ভবত আমার স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে, তবে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর লেখা "ফল অব ঢাকা" বইয়ে পড়েছি, সে আলাপে বঙ্গবন্ধু আচমকা মিসেস গান্ধীকে প্রশ্ন করেন, "আপনি সৈন্য প্রত্যাহার করছেন কবে?" মিসেস গান্ধী তখন বলেন: "আসছে ১৭ মার্চ!" বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে বলেন: "১৭ মার্চ? কেন?" মিসেস গান্ধী তখন বলেন: কারণ, সেটি আপনার জন্মদিন!"
১৯৭২ সালের ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের সপ্তাহখানেক আগেই ভারতের শেষ সৈন্যটি বাঙলাদেশের মাটি ত্যাগ করে।
বঙ্গবন্ধুকে যদি পাকিস্তান কারাগারে হত্যা করা হতো এবং তিনি আর বাঙলাদেশে ফিরে আসতে না পারতেন, তবে বাঙলাদেশে ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতির মেয়াদ ও ধরণ ভিন্ন হতো। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসম্বের থেকে ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাঙলাদেশে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিলো। এ সময় বাংলাদেশে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কর্তৃত্ব অনুশীলন নিয়ে অনেক বর্ণনা রয়েছে।
বিভিন্ন দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায়, সাহায্যের পর মিত্র-সেনাবাহিনী আর নিজ দেশে ফেরত যেতে চায়না বা ফিরতে অনেক দেরি করে [যেমন: দক্ষিণ কোরিয়া, আফগানিস্তান ও কুয়েতে মার্কিন সৈন্যের ক্রমাগত অবস্থান]। এক পর্যায়ে এরকম বাহিনীর ক্রমাগত অবস্থান/দখল বা কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ বা সমস্যাসংকুল বলে গণ্য হয় [দেখুন, আইসিজের নামিবিয়া ওপিনিয়ন, ১৯৭১ ও জেরুজালেম দেয়াল ওপিনিয়ন, ২০০৪]। কিছু ক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্বেও ভাগ বসে [আমেরিকা বনাম নিকারাগুয়া ১৯৮৬]।
আমাদের ওই অভিজ্ঞতার মধ্যে যেতে হয়নি
এ বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর সাফল্য একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। কিছু ন্যারেটিভসে আমরা দেখি, বাঙলাদেশে ভারতীয় সৈন্যের প্রলম্বিত উপস্থিতির ব্যাপারে মুজিবনগর সরকারের সাথে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের একটা অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়েছিল।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বদেশে ফিরে আসার পথে এবং পরের মাসে ফেব্রুয়ারির গোড়ায় কলকাতা সফরে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে একেবারেই অবাক করে দিয়ে দৃপ্তভাবে অনুরোধ করেন য্যানো বাঙলাদেশ থেকে দ্রুত ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্বকারি একমাত্র বাঙলাদেশি, কূটনৈতিক ও পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এক লেখায় মন্তব্য করেছেন যে, ১৬ই ডিসেম্বর বাঙলাদেশ পাকিস্তানি সৈন্যমুক্ত হয়, কিন্তু "স্বাধীন ও সার্বভৌম" হয় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে (মহিউদ্দিন আহমদ, জাসদের উত্থান পতন, ঢাকা, ২০১৪)।
পোস্ট-কনফ্লিক্ট সমাজে বিদেশী সৈন্যের উপস্থিতির আইনকে বলে "পোস্ট যাস বেলাম"। বলাই বাহুল্য, এই আইনের নীতিগুলো এখনো পুষ্ট নয়। উপস্থিতি ও অবস্থানের সম্মতি, আইনগত মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি, সার্বভৌমত্ব ও স্থানীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, কার্যক্রম চালিয়ে যাবার প্রয়োজনীয়তা, সম্পাদিত চুক্তি মেনে চলার তাগাদা ইত্যাদি নানা কারণে আইনের এই শাখাটি তাৎপর্যপূর্ণ। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইনের একটি আগ্রহোদ্দীপক উদহারণ।
তাহলে দেখা গেলো, অন্তত তিনটি দিক দিয়ে (নো কনফেডারেশন, স্বীকৃতি ও জাস বেলাম) বঙ্গবন্ধু শুধু তাঁর প্রত্যাবর্তনের তারিখেই আন্তর্জাতিক আইনে বাঙলাদেশকে প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ করেছেন।
এই ইতিহাস ও ঐতিহাসিকতা একটি উপলব্ধির বিষয়। মননের বিষয়। আপনারা জানেন যে, আন্তর্জাতিক আইনের একটি তৃতীয় বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। পাশ্চাত্য উদহারণ না খুঁজে, শুধু নিজেদের দিকে তাকালেই আমরা স্বদেশী এই দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাবো।
ঈ.
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এবং ১০ জানুয়ারি রেসকোর্সে দেয়া তাঁর ভাষণের সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক অনেক অর্থ হয়। সেটি এই লেখার আওতার বাইরে। অন্য দুই একটি বক্তৃতায় আমি সেটি বলেছি। এখানে শুধু বলতে চাই, বাঙালি কখনোই আত্ম-অনুসন্ধান করে না। ভেবে দ্যাখেনা, তাঁরা ওই "জয় বাঙলার দরবেশের" কাছে তাঁদের জাতিত্বের জন্য কতটা ঋণী!
উ.
লেখাটি শেষ করবো বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানের জেলে বন্দিদশা দেখেছেন এমন একজন বন্দি ভারতীয় গুপ্তচরের লেখা মন্তব্য দিয়ে। তাঁর নাম মোহনলাল ভাস্কর। ভাস্কর তাঁর সাড়া "অ্যান ইন্ডিয়ান স্পাই ইন পাকিস্তান" (সৃষ্টি পাব্লিশার্স, নিউ দিল্লি, ২০১২, পাতা ২৫২) বইয়ে লিখেছেন:
"আজও শেখ মুজিব মিয়ানওয়ালি জেলে যে দিনগুলো কাটিয়েছেন তা আমাকে তাড়িত করে। বারবার তারা তাঁর গলার ফাঁস প্রস্তুত করত এবং তাঁর প্রাণহীন দেহ গ্রহণের জন্য একটি কবর খনন করত .... কিন্তু শত্রুদের হাতে তিনি মারা যাননি। তিনি তাঁর নিজের লোকদের হাতে মারা গিয়েছিলেন যাদের তিনি তাঁর সন্তান বলে ডাকতেন। এটা সত্যিই বলা হয় যে, ভাগ্যের নেকড়ে একজন মানুষকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়, তাকে ক্লান্ত করে এবং যখন সে ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে পড়ে তখন সেই নেকড়ে তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে এবং গ্রাস করে।"
হায়রে নিয়তি! হায়রে দেশ!
ঊ.
১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে আমার ভিক্টোরিয়ান যুগের কবি রবার্ট ব্রাউনিঙ-এর 'দ্য প্যাট্রিয়ট' (১৮৫৫) কবিতার কথা মনে পড়ে। কবিতাটি আমরা ইন্টারে পড়ার সময় পড়তাম। কবিতায় দ্যাখা যায়, একজন প্যাট্রিয়ট দেশে ফিরেছেন, চারিদিকে লোকে-লোকারণ্য, গোলাপে ভরা রাস্তাঘাট, জগৎজুড়ে আনন্দগান ঘন্টাধ্বনি, হর্ষধ্বনি বাজছে।
লোকজন দেশপ্রেমিককে এসে বলল যে, এমনকি তুমি যদি সূর্যও চাও তাহলে আমরা তোমাকে তা এনে দিতে পারব। সূর্যের দ্যাখা সে মানুষেরা পায়নি, মোমের পাখা লাগিয়ে প্যাট্রিয়ট গ্রীক ইকারুশের মতন নিজেই গিয়েছিলেন সূর্যের কাছে, কিন্তু সূর্যের কাছাকাছি যত গেছেন, ততই মোম গলে গলে নিজেই ম্রিয়মাণ হয়ে গেছেন।
দেশের ভালো হয় এমন কোন কিছু করতে তিনি কার্পণ্য করেননি। কিন্তু, লোকেরা তাঁর ব্যর্থতা ক্ষমা করেনি। এখন এক বছর বাদে লোকেরা তাঁকে ভুল বুঝে হত্যা করার জন্য বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছে।
বধ্যভূমিতে যেতে যেতে প্যাট্রিয়ট নিজে এ সব কথা ভাবছেন। চারিদিকে বৃষ্টি নামছে। কেউ তাঁকে আজ দেখতে আসেনি, শুধু কতকগুলোন প্রান্তিক মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে নিষ্প্রভভাবে দেখছে সে দৃশ্য। কবিতার শেষ ছত্রে দ্যাখা যায় বধ্যভূমিতে যেতে যেতে প্যাট্রিয়ট নিজেকে বলছেন:
"Thus I entered, and thus I go!
In triumphs, people have dropped down dead.
‘Paid by the world, what dost thou owe
Me?’ – God might question; now instead,
‘Tis God shall repay: I am safer so."
[এভাবেই এলাম ও গেলাম,
আমার (সেই) বিজয়রেখায় মানুষ নিশ্চুপ হয়ে পড়ে আছে,
বিধাতা হয়তো আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, "দুনিয়ার প্রতিদান তো দেখলে, এখন আমার কাছে আর কি চাও"!
আমার কোন জবাব নেই, বিধাতাই প্রতিদান দেবেন, এবঙ তাতেই আমি সন্তুষ্ট]
ব্রাউনিঙ গোলাপ, সূর্য, বৃষ্টি এসব শব্দ দিয়ে অদ্ভুত সব ইমেজারি তৈরি করেছেন। সে কথায় আর যাব না। বঙ্গবন্ধু সোনার মানুষ চেয়েছিলেন। সোনার মানুষ হওয়া বাঙলাদেশের মানুষের ধাঁতে নেই। গোলামির জিঞ্জির থেকে স্বাধীনতা অম্লান সূর্যমুখী পেড়ে আনতে গিয়ে তিনি নিজেকে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে বিলীন করে দিয়ে গেছেন এই দেশের মানুষের জন্য।
প্রতিদান? বুলেট।
তোমাকে হাজার সালাম হে পেট্রিয়ট, হে শালপ্রাংশু বজ্রমানব শেখ মুজিবুর রহমান!
জয় বাঙলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক: বিল্লাহ মাসুম
অধ্যাপক, আইন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়