জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—সবখানেই এখন ‘জুলাই চেতনা’ একটি প্রভাবশালী পরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই চেতনার বাস্তব প্রয়োগ কি সমাজকে আরও সহনশীল ও বহুত্ববাদী করছে, নাকি উল্টোভাবে ভিন্ন মত, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন ধর্মীয় অনুশীলনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে?
হাইকোর্ট সংলগ্ন শাহ খাজা শরফুদ্দিন চিশতীর মাজারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনা এই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রায় সাত শতাব্দীর ইতিহাসে এই প্রথম ওই মাজারে তিন দিনব্যাপী ওরশ আয়োজন কার্যত বন্ধ হয়ে গেল। মুঘল, পাঠান, সুলতানি, ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পুরো সময়জুড়ে যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুশীলন অব্যাহত ছিল, তা হঠাৎ করে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়া হলো।
ওরশ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্ত-আশেকান, সাধু, পাগল, বাউল, আলেম, নারী-পুরুষ—সবার উপস্থিতি ছিল এই মাজারকেন্দ্রিক বহমান লোকধর্মের একটি স্বাভাবিক চিত্র। এরা কেউ রাজনৈতিক শক্তি নয়, কেউ ক্ষমতার অংশীদার নয়। তবু তাদেরকে রাতের আঁধারে মারধরের শিকার হতে হয়েছে, কখনো ছাত্র পরিচয়ে, কখনো পুলিশের লাঠির আঘাতে। প্রশ্ন উঠছে—এই সহিংসতা কি নিছক আইনশৃঙ্খলার বিষয়, নাকি এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির আধিপত্য কাজ করছে?

জুলাই আন্দোলনের ভাষ্য ছিল বৈষম্যহীনতা, নিপীড়নের অবসান এবং জনগণের মুক্তি। কিন্তু বাস্তবে যদি সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারীরা নির্দিষ্ট ধরনের ধর্মচর্চাকে ‘গ্রহণযোগ্য’ এবং অন্য ধারার ধর্মীয় সংস্কৃতিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে চিহ্নিত করে, তাহলে তা স্পষ্টতই একটি উগ্র প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে। সুফি-ঐতিহ্য, লোকধর্ম, মাজার সংস্কৃতি—এসব এই অঞ্চলের ইসলামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোকে দমন করা মানে কেবল একটি ধর্মীয় অনুশীলন বন্ধ করা নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যের ওপর আঘাত।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই দমন-পীড়নের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অক্ষমতা। ভক্তদের প্রশ্ন ছিল খুব সাধারণ—ওরশ করলে রাষ্ট্রের কী ক্ষতি হয়? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাদের ওপর হামলা করল? কেন শত বছরের চর্চা হঠাৎ অবৈধ হয়ে গেল? এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর না থাকাই প্রমাণ করে, এখানে সিদ্ধান্তগুলো প্রশাসনিক যুক্তির চেয়ে আদর্শিক মনোভাব দ্বারা বেশি প্রভাবিত।
জুলাই আন্দোলন যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক ও মুক্তিকামী হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সহনশীলতা। ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন পোশাক, ভিন্ন ধর্মীয় অনুশীলনকে জায়গা দেওয়ার মানসিকতা ছাড়া কোনো আন্দোলনই গণমুখী থাকতে পারে না। অন্যথায় ‘চেতনা’র নামে যে শক্তি গড়ে উঠছে, তা ধর্মীয় উগ্রবাদেরই আরেক রূপ—যেখানে লাঠি ও ক্ষমতা দিয়ে ঠিক করে দেওয়া হয়, কে কোন ধর্ম পালন করবে এবং কীভাবে করবে।
হাইকোর্ট মাজারের ঘটনা তাই বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি সতর্ক সংকেত। এখনই যদি প্রশ্ন না তোলা হয়, যদি এই প্রবণতার সমালোচনা না হয়, তাহলে জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার ইতিহাসে গণতন্ত্র নয়—বরং নতুন ধরনের দমননীতি হিসেবেই চিহ্নিত হতে পারে।