মাহমুদ-উল হাসান বাপ্পি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। স্নাতক, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগ থেকে। লেখালেখি তার একান্তই ব্যক্তিগত পরিসরে থাকে, এই ব্যক্তিগত সীমানা থেকে তার নিপুণ সৃষ্টিগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে প্রথমবার দ্য ভয়েস২৪ এর পক্ষ থেকে 'মূর্ছিত ইহলোক'- এর কবি মাহমুদ-উল হাসান বাপ্পির তিনটি কবিতা পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হল।
বেনামী বিষাদ
অদ্ভুত বেনামী বিষাদে আক্রান্ত আমার হৃদয়,
তোমার মেঘরঙা চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়,
আমি এ পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগ্য প্রেমিক—
তোমার পায়ে সঁপে দিয়েছি কেবল অনিশ্চয়তার অর্ঘ্য।
তোমার পায়ের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শিউলির মতো,
বিচ্ছিন্ন সৌরভে মুখর আমার সংলগ্ন জীবনের অবয়ব।
ঘাসের মাথায় শিশিরবিন্দু খচিত মুকুট হয়ে-
জমে থাকে আমার চিরায়ত বেদনাবোধ,
তুমি মাড়িয়ে গেলেই মুষলধারে বৃষ্টির মতো ঝরে যায়,
তীব্র অবসাদের পর তুমুল প্রশান্তি হয়ে তৃষ্ণার্ত মাটির বুকে,
আমি অবিচল তাকিয়ে থাকি করুণার দিব্যলোকে,
দিগন্ত জুড়ে বয়ে যায় ঝরাপাতার অবিমিশ্র শোক,
ক্লান্তির ছায়া যেন লেগে থাকে মুখে, মূর্ছিত ইহলোক।
তোমাকে দেখছি আপেক্ষিক না দেখায়
দিন কেটে যাচ্ছে বিমর্ষ ব্যস্ততার ফাঁদে,
উত্তরাধুনিক বাস্তবতার বিষবাষ্পে পিষ্ট হয়েছে আমাদের প্রশান্ত বিকেল,
তীব্র আলোক দূষণের ঝলকানিতে হারিয়ে গেছে সন্ধ্যা,
সংকট আর সংঘাতে ফিরে এসেছে বিস্মৃত সাংস্কৃতিক মন্দা।
আমাদের রাত ছিনতাই হয়েছে ক্লান্তি আর পরাবাস্তব উন্মাদনার ভিড়ে,
হারিয়ে ফেলেছি মুক্ত বাতাস, পাখিরা ফিরছে না আর অনিরাপদ নীড়ে,
সব মেনে নিতে নিতে বিলিয়ে দিয়েছি আমাদের সর্বশেষ কামনা,
তবুও হাসিমুখে জড়িয়ে নিচ্ছি সমস্ত নশ্বর যাতনা।
আমাদের ঝড় থেমে গেছে এই বিপর্যস্ত আবহাওয়ায়,
আমরা বেঁচে থাকছি কেবল আন্ত:নাগরিক অস্থিরতায়,
আমাদের স্বপ্নেরা বাসা বেধেঁছে সভ্যতার মুখোশ পরা
কপট বেদনাবোধের জালে,
যতটুকু ভালোবাসা না পেলে, কেউ মরে যায়-
আমাদের উপহাসে ঝরে যায় তার চেয়ে বেশি।
অনাগ্রহ আর অনভ্যাসে আমাদের থেকে যায় কেবল
অনুভূতিহীন নির্বাসিত স্মৃতির ক্ষীণ সুখ।
আমাদের দেখা হোক —
হয়তো এই অবসাদপূর্ণ শহরে নয়,
যাপিত জীবনের নিদারুণ ব্যস্ততায় নয়,
এই অন্ধকার নিমজ্জিত মহাশ্মশানে নয়।
অন্তত একটি দীর্ঘশ্বাস অনুভব করতে পারার মতো অবসর দাও —
সামান্য সময় উপভোগ করার মতো নির্জনতায়,
আমাকে ছুটি দাও অবধারিত বিষন্নতায়,
আকস্মিক ধুলায় মিশে যাক এই বায়বীয় দিব্যলোক-
আমাদের তবু দেখা হোক।
পরার্থপর
এমন সব উদ্বিগ্ন সমাবেশ থেকে—
ভেসে আসুক প্রশান্তির হাওয়া অথবা ঝড়,
তোমার প্রিয় সুর বাজুক সমস্ত বিশেষ ঘোষণায়,
তোমার ইচ্ছার পায়ে লুটায়ে পড়ুক প্রমত্ত জলোচ্ছাস।
অবোধ্য বাস্তবতা তোমারে যে বানাইলো অনুভূতিহীন-
নির্বিকার, তার ছাপ মুছে যাক। কারো অনুপস্থিতিতে-
তুমি হাসো, হয়তো কারো সামান্য ভালোবাসার দোহাই-
তাতে ছিড়েখুঁড়ে গেলেও, তুমি হাসো।
এইবেলা ভুলে যাও যে, পেছনে তাকাতে হয়!
তারে ফিরায়া দেয়ার উদাসীনতা দেখাইতে তুমি অপারগ নও।
সুতরাং তোমার প্রতিটা পূর্ণতার লালিত মুহুর্তে যে নাই,
তারেই শোনাও সব বেদনার গল্প।
এত সুখ-সংবাদ সে লুকাবে বলেই হয়তো,
দখল করেছে মহাবিধ্বংসরোধী পাতাল বাঙ্কার।
সেখানে একান্ত মুহুর্তে তোমার উপলক্ষহীন আনন্দের সাক্ষাৎকার।
তাকে সাক্ষী রাখো—সব অপ্রাপ্তি আর বেদখল ভূমির মালিকানায়,
নিপীড়িত মুখের ম্লান হাসি আর চোখের রেখায় মিলিয়ে যাওয়া
প্রতিটি অনাহুত সংগ্রামের ছবিতে ভেসে থাকুক তোমার নাম।
তুমি দয়া করে ফিরে তাকাইয়ো না,
যেতে থাকো সন্ধানী মিছিলের সর্বাগ্রে, যেখানে তোমার অসংলগ্ন-
ভালোবাসা মিশে গেছে অপার্থিব বাস্তবতায়।