সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার মিলছে না রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায়। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য যেখানে ১ হাজার ২৫৩ টাকা, সেখানে ভোক্তাদের দিতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও এই দামেও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ সংকট, আমদানি হ্রাস এবং নজরদারির ঘাটতিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কাওসার খান জানান, ২৪ ডিসেম্বর সকালে এলপিজি শেষ হওয়ার পর পাড়ার একাধিক দোকানে ফোন করেও সিলিন্ডার পাননি। পরে অন্য একটি দোকানে খোঁজ পেয়ে দেড় হাজার টাকা দিয়ে কিনতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ‘এক সিলিন্ডারের দাম দিতে হয়েছে দেড় হাজার টাকা। হঠাৎ এমন দাম বৃদ্ধি চিন্তা করা যায় না।’
কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা ফারজানা নীলা বলেন, ৩০ ডিসেম্বর বিভিন্ন দোকানে খোঁজ করেও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার মিললেও দাম দিতে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা আসমা আখতার। তিনি বলেন, ৩১ ডিসেম্বর ১ হাজার ৮০০ টাকায়ও এলপিজি পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য দিতে হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকা, যদিও ডিসেম্বরে সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা।
গৃহস্থালিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত দুই সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ঢাকার চারটি খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদা থাকলেও তাঁরা পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না। ফলে নিজেরাও বেশি দামে কিনে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান। অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে ২০০ থেকে ৩০০ সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাক গিয়ে বসে থাকছে, খরচ বাড়ছে। প্রতি সিলিন্ডারে কোম্পানি ৭০ থেকে ৮০ টাকা বাড়তি দাম নিচ্ছে।’
সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর আগে বাজারে দাম বাড়ানো ঠিক নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়তি নেওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। খুচরা বিক্রেতারা এটা ঠিক করছেন না।’
শীত মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বাড়ে, ফলে দামও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে আমদানিজনিত জাহাজসংকটে। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনকারী ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়ায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে আগের মাসের তুলনায় গত ডিসেম্বরে আমদানি কমে গেছে।
বিইআরসি ও এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র জানায়, সাধারণত প্রতি মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়। কিন্তু ডিসেম্বরে আমদানি নেমে এসেছে ৯০ হাজার টনে। পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি চাহিদামতো জাহাজও পাওয়া যাচ্ছে না। এসব কারণে কিছু কোম্পানি বাড়তি দাম আরোপ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে, ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সরবরাহের সংকটেই মূলত বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবু তাঁরা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি সরবরাহ করছেন। তবে খুচরা বিক্রেতারা তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুতর বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিষয়টি নজরে আসায় গত বৃহস্পতিবার বিইআরসি লোয়াবকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ডিসেম্বরে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫৩ টাকা। কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, মজুত, বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউশন কিংবা খুচরা—কোনো পর্যায়েই নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘কাগজে-কলমে বাড়তি খরচের বিষয়টি নিশ্চিত হলে কমিশন নতুন মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় নেবে। তার আগে বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, বাড়তি দামের অভিযোগ পাওয়ায় লোয়াবকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
দাম নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে কি না—এ নিয়ে বিইআরসির ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত। কমিশনের নিজস্ব বাজার নজরদারি সক্ষমতা সীমিত বলে কর্মকর্তারাই স্বীকার করেন। অনেক সময় জেলা প্রশাসনের সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠানো হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মনে করে, আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিইআরসি তা পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারছে না। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরবরাহ না থাকলেও বেশি দামে তো ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। অথচ বেশি দামে বিক্রি আইনত অপরাধ। বিইআরসি সেই শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সংস্থাটির প্রতি ভোক্তার অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের কোনো দপ্তর বাড়তি দামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কোনো সভ্য সমাজে এটা হতে পারে না।’
সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এলপিজির দাম এখন সাধারণ ভোক্তার জন্য নতুন করে চাপ তৈরি করেছে, যা দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।